হেক্টর বার্লিওজ যখন প্যারিসে থাকতেন তখন আরেক বিখ্যাত সংগীতকার কেবল মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছিলেন: ফ্রেডেরিক শোপান (১৮১০-১৮৪৯)। রোগা পাতলা এই ওস্তাদ পিয়ানোবাদকের বাড়ি পোল্যান্ডে। শোপান একাই পিয়ানো সংগীতের দুনিয়ায় বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছিলেন। পিয়ানোতে কী কী করা সম্ভব সেই সম্পর্কে তিনি সবার ধারণাই বদলে দিয়েছিলেন।
পোল্যান্ডের শৈশব
এই লেখার অন্যান্য সংগীতকারদের মতোই ফ্রেডেরিক শোপানও ছিলেন এক বিস্ময় বালক। মাত্র সাত বছর বয়সে তিনি পোল্যান্ডে প্রথম সংগীত রচনা করেন। এর মাত্র এক বছর পর, তিনি কনসার্ট পিয়ানো বাদক হিসেবে যাত্রা শুরু করেন। তাঁর শৈশব জুড়ে ছিল পোল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী নাচের সুরে ভরা, যেমন পোলানাইজ এবং মাজুরকা। এইসব সুর তাঁর বাদবাকি জীবনেও প্রভাব রেখেছিলো।
ফ্রেডেরিক তাঁর সমস্ত সংগীত পিয়ানোতে বসেই বানাতেন এবং তিনি সেগুলোর উপরে ইম্প্রোভাইজ করতেও খুব পছন্দ করতেন। আসলে তিনি স্বরলিপি লিখতে খুবই অপছন্দ করতেন কারণ তাঁর মনে হতো এতে গানের গঠন আটকে যায়। তবে দুর্ভাগ্য যে, শোপানের তাৎক্ষণিকভাবে তৈরি গানগুলো আর পাওয়া যায় না।
একুশ বছর বয়সে শোপান যখন প্যারিসে যান তখন তাঁর দক্ষতা দেখে সবাই তাক লেগে গিয়েছিলো। কেউ আগে কখনো এইরকম সুর শোনেনি। দুর্ভাগ্যবশত, তিনি এতোই রোগা এবং অসুস্থ ছিলেন যে, খুব বেশী কনসার্টে বাজাতে পারতেন না। তবুও, তিনি তাঁর সংগীত বেচে এবং পিয়ানো শিখিয়ে মোটামুটি চালিয়ে নিতে পারতেন। তিনি সাধারণত কম চাপ সামলাতে হয় এইরকম ছোটো ছোটো ‘সেলুন’ কনসার্টগুলোতে বাজাতেন, মানে ঘরোয়া কনসার্টগুলোতে। এই কাজে তিনি অসম্ভব সফল হয়েছিলেন।
ছোট্ট আঙুল কিন্তু বড় হৃদয়
শোপানের হাতের আঙুলগুলো ছিল ছোটো ছোটো। কিন্তু ওই ছোটো আঙুল দিয়েই তরুণ ফ্রেডেরিক কিবোর্ডের সর্বত্রই হাত পৌঁছাতে পারতেন। তাঁর সংগীতে স্বরের ঠাসবুনট ছিল, যেন একটা ঘুর্ণি, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে চলছে। তাঁর সুর কোমল, রোমান্টিক এবং শান্ত। শোপানের সুরে খুব তীব্র ক্ষোভ বা দুঃখ দেখা যায় না।
প্যারিসে শোপানের বিখ্যাত প্রেম ছিলো জর্জ নামের এক লেখিকার সঙ্গে। তিনি জর্জ স্যান্ড ছদ্মনামে লিখতেন। তাঁর আসল নাম ছিলো আমান্দাইন অরোরে লুসিল ডুপিন।
জর্জ পুরুষদের মত কাপড় পরতে পছন্দ করতেন, মদ খেতেন এবং ধূমপান করতেন এবং ফ্রেডেরিকের উপর ছিলেন চরম কর্তৃত্বশীল। একবার তিনি তাঁর কুকুরকে নিজের লেজ নিয়ে খেলতে দেখে শোপানকে বলেছিলেন, ‘আমি যদি তোমার মত প্রতিভাবান হতাম তাহলে এই কুকুরের কাণ্ড নিয়ে একটা সুর তৈরি করতাম।’
শোপান সঙ্গে সঙ্গে পিয়ানোতে গিয়ে ওয়াল্টজ ইন ডি-ফ্ল্যাট মেজর বা দ্য লিটল ডগ ওয়াল্টজ বানিয়েছিলেন।
যদি ভেবে থাকেন শোপানকে কখনো শোনেননি তাহলে ভুল হবে। বিখ্যাত ফিউনেরাল মার্চ, এতোই বিষাদময় যে, রোড রানার বা বাগস বানি কার্টুনে প্রায়ই ব্যবহার করা হতো। এটি আসলে একটি সোনাটার অংশ। তাছাড়া, ব্যারি ম্যানিলো এর বিখ্যাত গান ‘কুড ইট বি ম্যাজিক’ থেকে ব্যারির কণ্ঠ ফেলে দিয়ে শুধু পিয়ানোটুকু শুনুন, দেখবেন পেছনে বাজছে শোপানের প্রিলুড ওপাস ২৮, নং ২০ ইন সি মাইনর।
শোপান শুনতে হলে এই সুরগুলো অবশ্যই শুনতে হবে:
●24 Preludes, opus 28
●Ballade no. 4 in F minor, opus 52
●Piano Concerto no. 1 in E minor, opus 11
●Piano Concerto no. 2 in F minor, opus 21
রবার্ট শুম্যান
রবার্ট শুম্যান (১৮১০-১৮৫৬) প্রথম সারির জার্মান রোমান্টিক সংগীতকারদের একজন। যদিও সেইসময় সবাই এই ব্যাপারটা বুঝতে পারেনি। শুম্যান ছোটোবেলাতেই কিবোর্ডে তাঁর প্রতিভার সাক্ষর রাখেন। দুর্ভাগ্যবশত, মিসেস শুম্যান, মায়েরা যেমনটা চান আরকি, তাঁর পুত্রের জন্য আরও ভালো কোনো পেশার কথাই চিন্তা করেছিলেন, যেমন: আইন পেশা। রবার্ট কোনোমতে ইউনিভার্সিটি অফ লিপজিগের আইন বিভাগে ভর্তি হয়েছিলেন ঠিকই। দুর্ভাগ্যবশত লিপজিগেই মিসেস শুম্যানের পুত্রের সঙ্গে ফেলিক্স মেন্ডেলসনের দেখা হয়ে যায় এবং তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়। অতি দ্রুতই বার্লিওজের মতো শুম্যানও সংগীতকার হওয়ার জন্য পড়াশোনা ছেড়ে দেন।
রবার্ট ফ্রেডরিক ওয়েইক নামের এক অসাধারণ শিক্ষকের কাছে তিনি পুরোদমে পিয়ানো শিখতে শুরু করেন এবং যৌবনের তাড়নায় একেবারে হুড়মুড়িয়ে পড়ে যান শিক্ষকের মেয়ে ক্লারার প্রেমে।
ক্লারাকে পাবার বেপরোয়া অভিযান
ক্লারা নিজেও এক বিস্ময়কর সংগীত প্রতিভা ছিলেন। নয় বছর বয়সে তিনি পিয়ানোর ওস্তাদ হিসেবে জার্মানি ভ্রমণ করেন এবং তখন ষোলো বছর বয়সেই তাঁর বেশ নামডাক হয়েছিল। বাপ ওয়েইক জানতেন না যে, যুবক-যুবতীদের যে কাজটা করতে নিষেধ করা হয় তারা সেটাই অবধারিতভাবে করে বসে। তাই ক্লারা শুম্যানকে বিয়ে করে ফেললেন। এই কাজ করতে তাঁদের পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে এবং মামলাও করতে হয়েছিলো। তবে, শেষপর্যন্ত তারা বিয়েটা করতে পেরেছিলেন।
ব্যক্তিগতভাবে, শুম্যানের জীবনের পরবর্তী সময়গুলো ছিল সবচেয়ে আনন্দের। তবে পেশাগতভাবে ছিল আকাল। মানুষের বাম হাতের অনামিকা সবচেয়ে কম নড়াচড়া করানো যায়। তো, বাম হাতের অনামিকার শক্তির বাড়াতে শুম্যান এক বুদ্ধি করেছিলেন। তিনি ওই আঙুলের সাথে একটা সুতো বেঁধেছিলেন এবং ঘুমানোর সময় সেই সুতোটি ঘরের সিলিঙের সঙ্গে বেঁধে রাখতেন। তাঁর হিসাবমতে এতে আঙ্গুলের টেন্ডনের প্রসারণ হবে এবং আঙুলে আরও শক্তি পাওয়া যাবে। কিন্তু, বাস্তবে দেখা গেল তার ওই আঙুলটি পুরোপুরি অকেজো হয়ে গেলো।
এভাবে পিয়ানো বাজানোর ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাবার পর শুম্যান সংগীত রচনার দিকে পুরোপুরি মনোযোগ দিলেন। তিনি বেশীরভাগ পিয়ানোর সুরই লিখেছিলেন, সেইসঙ্গে এবার যুক্ত হলো সিম্ফোনি এবং দুর্দান্ত সব পিয়ানো কনসার্টো।
সত্যিকার রোমান্টিক
সত্যিকার রোমান্টিক যুগে, সুরের গঠন, ধাঁচ, তার পেছনের যুক্তি এইসবের চেয়ে সুরের মাধ্যমে অনুভূতিকে প্রকাশ করতে পারাটাই ছিল মুখ্য। আর শুম্যানের এই ব্যাপারে কোনো জুড়ি ছিলো না। তাঁর ব্যক্তিত্ব বিপরীতমুখী বৈশিষ্ট্যগুলোর মাঝে দুলতো - বহির্মুখীতা আর কঠোর পরিশ্রম, অবসন্নতা আর আত্মমগ্নতা। তাঁর মনে হত যেন তিনি দুজন ভিন্ন মানুষ - এমনকি, তিনি এদের নামও দিয়েছিলেন: বর্হিমুখী সত্তার নাম ফ্লোরেস্টান আর অন্তঃমুর্খী সত্তার নাম দিয়েছিলেন ইউসেবিয়াস।
আমরা এখন শুম্যানের এই সমস্যার ডাক্তারি নাম জানি, তিনি ছিলেন একজন বাইপোলার (সম্ভবত বেটোভেনও তাই)। দুর্ভাগ্যবশত, তাঁর ভয়াবহ বিষণ্ণতা পরে হ্যালুসিনেশন হয়ে সারাজীবন ভুগিয়েছে। চুয়াল্লিশ বছর বয়সে, মধ্যজীবনের যন্ত্রণায় গিয়ে শুম্যান রাইন নদীতে ডুবে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। বার্লিওজের জীবনী না পড়ার কারণে তিনি হয়তো বুঝতে পারেন নাই আত্মহত্যা করা কতো কঠিন। বার্লিওজের মতোই শুম্যানকেও জাল দিয়ে জ্যান্ত উদ্ধার করা হয়। দুঃখের কথা হল তাঁর জীবনের শেষ দুই বছর পাগলাগারদে কাটে।
শুম্যানের সেরা কাজ হল তাঁর কিছু একক পিয়ানো সংগীত। এছাড়া বিশেষ করা শুনতে হবে:
●Carnaval
●Fantasiestücke (Fantasy Pieces)
●Kreisleriana
●Kinderszenen (Scenes from Childhood)
●Symphony no. 2 in C major, opus 61
●Symphony no. 3 in E‐flat major (Rhenish), opus 97
মেন্ডেলসনের মৃত্যুর সময়েই সংগীতের এক নতুন যুগের সূচনা ঘটছিলো। ক্লাসিকাল যুগের সময়কালের যে বুদ্ধিবৃত্তিক, যৌক্তিক সংগীত, সেটা রোমান্টিক যুগে আস্তে আস্তে মিলিয়ে গেলো। এই যুগে অনুভূতি, আবেগ এবং ভিতরের কৌতুহলী শিশুসত্তাটি প্রাধান্য পেতে থাকলো। রোমান্টিক সংগীতকারগণ বেশীরভাগ সময়ই প্রকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত হতেন, যেমন: সূর্যোদয়, বিদ্যুৎ চমক বা চাষের সময় ইত্যাদি।
কার্ল মারিয়া ভন ভেবার
আত্মসম্মান বোধসম্পন্ন আর দশজন রোমান্টিক সংগীতকারের মত কার্ল মারিয়া ভন ভেবারও (১৭৮৬-১৮২৬) অসংখ্য রোমান্টিক ধারার সুর রচনা করেছেন। কিন্তু, সেই সময়ে সংগীতকে যাপন করে দেখাবার ব্যাপারে তাঁর যে অবদান সেই কারণেও তিনি স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন।
ভেবারই হলেন প্রথম অর্কেস্ট্রা পরিচালক যিনি বাদকদের বসার জায়গা নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন, যে পদ্ধতিটি আজও ব্যবহৃত হচ্ছে। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি অর্কেস্ট্রার প্রতিটা অংশের জন্য আলাদা আলাদা রিহার্সাল করতেন। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে ব্যাটন হাতে নিয়ে অর্কেস্ট্রা পরিচালনা করতেন। এবং তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি তাঁর পরিচালিত সকল অংশের উপরেই অসাধারণ শৈল্পিক দক্ষতা দেখাতে পেরেছিলেন। এতোটুকু বলাও আসলে যথেষ্ট নয়। তিনি আসলে পৃথিবীর অন্যতম সেরা পিয়ানো বাদকদের একজন।
ভেবার জার্মান রোমান্টিক অপেরার জনক হিসেবেও পরিচিত। রোমান্টিক যুগের একজন পথপ্রদর্শক কার্লের মৃত্যুও হয়েছিল রোমান্টিক যুগের মধ্যভাগেই, টিউবারক্লোসিস রোগে। রোমান্টিক যুগের বহু শিল্পীই এই রোগে মারা গিয়েছিলেন।
ভেবারের বেশীরভাগ বিখ্যাত কাজই অপেরা নিয়ে, তবে তিনি পুরোপুরি বাজনা নির্ভর কাজও করেছিলেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে পিয়ানো, ক্লারিনেট, হর্ন এবং বেসুনের জন্য কনসার্টো। তিনি দুটি বিরল সিম্ফোনিও লিখেছিলেন যেগুলো খুব বেশী শোনা যায়না।
ভেবার ছিলেন মেজাজকে ধরতে পারার ওস্তাদ। তিনি বিভিন্ন আবহ তৈরি করতেন। যেমনটা তিনি করে দেখিয়েছিলেন ডার ফ্রেসুৎজের এক ক্লাইম্যাক্সে ভরা একটা দৃশ্যে ভয়ে কাঁপা, খল এবং দৈব আবহ তৈরি করে। এটা ছিল একটা গথিক ভয়ের গল্প। আসলে সেই যুগটাই ছিল গথিক ভয়ের গল্পের যুগ। এই সময়ই মেরি শেলী ফ্রাঙ্কেনস্টাইন লিখেছিলেন।
ভেবার রোমান্টিক যুগের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি করেছিলেন যা পরবর্তী সংগীতকারদের প্রভাবিত করেছিল। ভেবারের উল্লেখ যোগ্য কাজগুলো হল:
●Overture to Der Freischütz ●Overture to Euryanthe ●Clarinet Concerto no. 2 in E‐flat major, opus 74
হেক্টর বার্লিওজ
সংগীতের ইতিহাসে বেশীরভাগ বিখ্যাত নামই বিখ্যাত এই কারণে যে তাঁরা সংগীতের নিয়মকানুন ভেঙেছিলেন। আর হেক্টর বার্লিওজ (১৮০৩-১৮৬৯) বিখ্যাত এই কারণে যে তিনি নিয়মকানুনের কোনো তোয়াক্কাই করতেন না ।
বার্লিওজ একদিক থেকে বেটোভেনের চেয়েও বড় আবিষ্কর্তা। বুঝতে হলে তাহলে বেটোভেনের সিম্ফোনি শোনার পরেই বার্লিওজের সিম্ফোনি ফ্যান্টাস্টিকটা শুনে দেখেন, বেটোভেনের মৃত্যুর মাত্র তিন বছর পরে তৈরি করা। অথচ, তার সুর শুনেই মনে হবে বার্লিওজ যেন অন্য গ্রহ থেকে এসেছেন।
বার্লিওজের জন্ম ফ্রান্সে, গ্রেনোবেলের কাছাকাছি এক স্থানে। তাঁর ডাক্তার বাবা চেয়েছিলেন তাঁর পুত্রও ডাক্তারই হোক। তবে প্যারিসে ডাক্তারি পড়ার সময়ই বার্লিওজ আরও অনেক বিখ্যাত সংগীতকারের মতোই ডাক্তারি পড়া ছেড়ে দিয়ে গানের জগতে ঢুকে পড়েন। কেন তাঁর এই পরিবর্তন? হয়তো সংগীতের প্রতি টান। কিংবা হয়তো শবদেহ ব্যবচ্ছেদ করার ভয়। তিনি লিখেছিলেন:
আমি যখন সেই মানুষের অঙ্গ-প্রতঙ্গে ভরা ওই ভয়ংকর ঘরটাতে ঢুকতাম এবং দেখতাম দেহ থেকে মাথা কেটে পড়ে আছে, যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেখানে রক্তে ভেসে যাচ্ছে, কাকেরা অবশিষ্টাংশ কামড়াকামড়ি করে খাচ্ছে আর ইঁদুরেরা এককোণে মানুষের ভার্টিব্রার উপর কামড় বসাচ্ছে, তখন এক ভয়ংকর অনুভূতি আমাকে গ্রাস করে ফেলতো আর মনে হতো আমি এক্ষুনি জানলা দিয়ে লাফ দিয়ে বেরিয়ে বাড়ি চলে যাই। মনে হত যেন মৃত্যু আমাকে পেছন থেকে ধাওয়া করছে।
নতুন ধরনের সংগীত
বার্লিওজ প্যারিস কনজার্ভেটরিতে এক ভয়াবহ নিয়মানুবর্তি সংগীতকার লুইজি কেরুবিনির কাছে সংগীতের তালিম নিতে যান। দুর্ভাগ্যবশত, বার্লিওজ কেরুবিনির প্রত্যেকটা মতকেই অপছন্দ করতেন। বিশেষ করে নানান কৌতূহলী চিন্তাগুলোকে নাকচ করে দিয়ে সংগীতের নিয়মকানুনের অন্ধ অনুকরণ করতে বলার বিষয়টি। বিদ্রোহী বার্লিওজ নতুন ধরনের সুর করতে চেয়েছিলেন এবং এই অন্ধ নিয়মানুবর্তি লোক যে কিনা তাঁকে বুঝতেই পারে না তাঁর সঙ্গে আর থাকতে পারছিলেন না।
তাঁর সংগীত জীবনে তিনি সংগীতের প্রত্যেকটা ধারাকে নিয়েই পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন। এরমধ্যে হারমোনির নিয়মকানুন, সিম্ফোনির গঠন, সুর তৈরির নিয়ম, অর্কেস্ট্রায় বাদকদের সংখ্যা কোনোকিছুই বাদ যায়নি। যে প্রথাটিকে মনে হতো তিনি যা বলতে চান সেটি প্রকাশ করতে পারছে সেটিকে তিনি রেখে দিতেন। আর যদি মনে হতো পারছে না, তাহলে সেটা ভেঙে ফেলতেন।
সাতাশ বছর বয়সে বার্লিওজ সম্মানজনক প্রিঁ দ্য রোম জেতেন। এটি রোমে থেকে সংগীত শেখার যাবতীয় খরচ সমেত সংগীতকারদের জন্য চার বছর মেয়াদী একটি বৃত্তি। তবে, তিনি সেখানে খুব বেশী সংগীত চর্চার অবকাশ পাননি, তিনি শহরটা ঘুরে দেখাতেই বেশী ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু এটা তাঁকে তাঁর পরবর্তী কাজের ক্ষেত্রে অনেক অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল, যার মধ্যে রয়েছে তাঁর অন্যতম সেরা একটি কাজ রোমান কার্নিভাল ওভার্চার।
হেক্টরের খুব বেশী এগোতে না পারার আরেকটা কারণ হল প্যারিসে ফেলে আসা ক্যামিলা নামের এক নারীর প্রতি তাঁর প্রেম। চার মাস রোমে থাকার পর তাঁর কানে খবর আসে যে ক্যামিলার নতুন প্রেমিক জুটেছে। এই খবরে তিনি ভেঙে পড়েন। নতুন প্রেমিকটিকে খুন করার জন্য তিনি একটা পিস্তল কেনেন এবং নারীর বেশ ধরে প্যারিসের উদ্দেশ্যে ট্রেনে রওনা দেন। ট্রেন ইতালির জেনোয়াতে পৌঁছানোর পর হেক্টরের মনে হলো যে ওই প্রেমিককে খুন করাটা অতি নাটকীয় কাণ্ড হয়ে যাবে। তার বদলে বরং মেডিটেরানিয়ান সাগরে ডুবে মরা যাক।
তাঁর আত্মহত্যা সফল হয়নি - জেলেরা তাঁকে জাল দিয়ে টেনে তোলে যাতে তিনি তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত সিম্ফোনিটা লিখতে পারেন। সিম্ফোনি ফ্যান্টাস্টিক ছিল সংগীত দিয়ে নারী পটানোর সবচেয়ে মোক্ষম পদক্ষেপ।
ফ্যান্টাস্টিকের গপ্পো
এক রাতে, বার্লিওজ রোমিও জুলিয়েটের একটা ইংরেজি পরিবেশনা দেখতে গিয়েছিলেন। যে অভিনেত্রী জুলিয়েটের চরিত্রে অভিনয় করছিলেন প্রথম দেখা থেকেই বার্লিওজ পাগলের মত তাঁর প্রেমে পড়ে গেলেন।
এই আইরিশ অভিনেত্রী হ্যারিয়েট স্মিথসন ফরাসি ভাষায় একটা শব্দও বলতে পারতেন না। আর এই ভাষাগত দূরত্বই বরং তাঁর আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিলো। হেক্টর তাঁকে চিঠি, উপহার, প্রেমপত্র এইসব পাঠাতেন। যেখানে ওই অভিনেত্রী যেতেন তিনিও সেখানেই চলে যেতেন, যাতে কোনোদিন সুযোগ মেলে। এবং, এক পর্যায়ে তিনি তাঁকে চমকে দিতে সফলও হলেন।
হ্যারিয়েট স্মিথসনের প্রতি বার্লিওজের এই আকর্ষণই তাঁকে পাঁচ মুভমেন্টের এক অদ্ভুত সিম্ফোনি লিখিয়ে নিয়েছিল - সিম্ফোনি ফ্যান্টাস্টিক। সিম্ফোনিটার গল্প হল এক তরুণ শিল্পী এক সাড়া না দেওয়া নারীর প্রেমে পাগল হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এই আকর্ষণ ফুটিয়ে তুলতে বার্লিওজ ‘আইডি ফিক্সে’ বা ‘ফিক্সড আইডিয়া’ নামের একটা থিম রচনা করেছিলেন। এই ছোট্ট সুরের টুকরাটি পুরো সিম্ফোনির মধ্যে বারবার ঘুরে ঘুরে আসতো।
বার্লিওজের কালের সংগীতের থেকে সিম্ফোনি ফ্যান্টাস্টিক এতোটাই অন্যরকম ছিলো যে বার্লিওজকে পরিচালকের উদ্দেশ্যে নোট লিখে দিতে হতো: ‘দয়া করে এই স্বরলিপিটাকে লেখার ভুল ধরে নেবেন না। সুরটা যেমন লেখা হয়েছে তেমনই ঠিক আছে। দয়া করে সংশোধন করবেন না।’
আর, বার্লিওজের কাছে সিম্ফোনি ফ্যান্টাস্টিক সফল ছিল অন্য কারণে। এতে কাজ হয়েছিলো। হ্যারিয়েট স্মিথসন এটার প্রিমিয়ারে এসেছিলেন এবং দেখে খুবই খুশী হয়েছিলেন। কনসার্ট শেষ হলে তিনি হেক্টরের সঙ্গে দেখা করেছিলেন, প্রেম করেছিলেন এবং পরবর্তীতে বিয়েও করেছিলেন।
এখানেই গল্পটা শেষ করতে পারলে ভাল হতো। কিন্তু ঘটনা এখানেই শেষ নয়। বিয়ের অনেক বছর চলে যাবার পরেও হ্যারিয়েট ফরাসি শেখেননি। এবং হেক্টরও কখনো ইংরেজি শেখেননি। এক পর্যায়ে এই নীরবতা চরমে উঠলে হেক্টর এবং হ্যারিয়েটের বিচ্ছেদ হয়ে যায়।
বেটোভেনের বয়স যখন বিশ বছর বয়স তখন ফ্রাঞ্জ শুবার্টের (১৭৯৭-১৮২৮) জন্ম। সাধারণত যা দেখা গেছে, প্রায় সকল বিখ্যাত সংগীতকারই একসময় ভিয়েনাতে গিয়েছেন। তবে, শুবার্টের জন্মই কিন্তু ভিয়েনাতে।
মোৎসার্টের মতো শুবার্টের সুরেও যেন মধু ঝরে পড়তো। তিনিও অবলীলায় একটার পর একটা সুর তৈরি করে যেতে পারতেন। আর তাঁর সুরগুলো মাথায় একদম গেঁথে যেতো, এমনকি সিম্ফোনিগুলোও।
শুবার্ট ছিলেন নিপাট ভদ্রলোক পিয়ানোবাদক। তবে মোৎসার্ট বা বেটোভেনের মতো ওস্তাদ লোকদের মতো তিনি বাজিয়ে অতো পয়সা কামাই করতে পারেননি। তবে তিনি তাঁর সংগীতের বন্ধুদেরকে সান্ধ্যকালীন আড্ডায় বেশ বিনোদন দিতেন। এই আড্ডার নাম তো পরবর্তীতে শুবার্টায়ার্ডস হয়ে গিয়েছিল। তাঁরা একসাথে বসতেন, গুলতানি মারতেন আর শুবার্ট তৎক্ষণাৎ যেসব সুর তৈরি করতেন সেগুলোর সঙ্গে নাচতেন।
তাঁর এই বন্ধুবাৎসল্য এবং ফুর্তির মেজাজের কারণেই বন্ধু মহলে তিনি ছিলেন তুমুল জনপ্রিয়। অবশ্য তিনি দেখতে তেমন সুদর্শন ছিলেন না। মানে, একেবারেই সুদর্শন ছিলেন না দেখে বন্ধুরা তাঁকে ঠাট্টা করে ডাকত ‘মাসরুম’।
যাহোক, তাঁর বন্ধুরা কিন্তু শুবার্টের বেকার এবং কপর্দকশুন্য দুর্দিনে ফেলে যায়নি, বরং এগিয়ে এসেছিলো। তখন ভিয়েনা হেইডেনকে নিয়ে মেতে ছিলো। আর বেটোভেন তখন তাঁর সক্ষমতা কেবল দেখাতে শুরু করেছেন। কাজেই, সিম্ফোনির দুনিয়ায় শুবার্ট পাত্তা পাননি। অপরদিকে, আরেক তরুণ সংগীতকার গিয়াসিনো রোসিনি তখন দুর্দান্ত সব অপেরা তৈরি করছিলেন (যেমন: দ্য বার্বার অফ সেভিল)। কাজেই, অপেরার দুনিয়াতেও তাঁর জুত করা সম্ভব ছিলো না।
তবে, শুবার্টের সিম্ফোনিগুলো কিন্তু অতো তীব্র ছিলো না। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত সিম্ফোনি হলো সিম্ফোনি নম্বর ৮ বা আনফিনিশড সিম্ফোনি। তিনি এটাকে জীবনের কোনো বড় বিপর্যয় যেমন মৃত্যু বা অন্যকোনো কারণে শেষ করতে পারেননি তেমন নয়, বরং, কী কারণে তিনি কেবলমাত্র চারটা মুভমেন্টের জায়গায় মাত্র দুইটা মুভমেন্ট পর্যন্ত লিখেছিলেন তা কেউ বলতে পারেনা। তবে, তিনটা মত আছে এই নিয়ে:
এক নম্বর মত: তিনি মনে করেছিলেন দুইটা মুভমেন্টই যথেষ্ট।
দুই নম্বর মত: শুবার্ট ওই দুইটা মুভমেন্টের সঙ্গে যায় এমন কোনো মুভমেন্ট আর চিন্তা করতে পারেননি।
তিন নম্বর মত: তিনি হয়তো লিখেছিলেন কিন্তু হারিয়ে ফেলেছিলেন। তবে, তিন নম্বর মুভমেন্টের একটা খসড়া কাঠামো সত্যিসত্যিই কিন্তু আছে।
এমনকি, অন্য অনেকেই এই সিম্ফোনির জন্য তিন এবং চার নম্বর মুভমেন্ট তৈরি করেছিলেন। কিন্তু, সেগুলোর কোনোটাই শুনতে দুইটার সঙ্গে মানানসই মনে হয়নি।
আনফিনিশড সিম্ফোনির পরে, শুবার্ট সিম্ফোনি নম্বর ৯ লেখেন। এর চলতি নাম ডাই গ্রোস বা দ্য গ্রেট। এটা তাঁর সবচেয়ে লম্বা সিম্ফোনি।
সংমেইস্টার শুবার্ট
তবে শুবার্টের সিম্ফোনিগুলো যতোটা সুন্দর, তারচেয়েও বেশী সুন্দর হলো শুবার্টের ছোট ছোট সুর, যেমন: ছোট ছোট পিয়ানোর সুরগুলো যেগুলোকে বলা হয় ইমপ্রম্পটু বা মোমেন্ট মিউজিকাল।
সবচেয়ে বড়কথা, তিনি গান বাঁধার ওস্তাদ ছিলেন। সবমিলিয়ে তিনি ৬০০টিরও বেশী গান বানিয়েছিলেন। এগুলোকে তিনি বলতেন লিডার।
শুবার্ট তাঁর লিডারগুলোকে একক কণ্ঠে গাওয়ার জন্য তৈরি করতেন, সঙ্গে সঙ্গত হিসেবে পিয়ানো। আসলে সঙ্গত করা বললে ভুল হবে, কারণ, গানগুলোতে পিয়ানোর গুরুত্বও কম ছিলো না। গায়িকা গ্রেশেন যখন কণ্ঠটা ওঠানামা করিয়ে গাইতেন তখন পিয়ানোতেও সুরের ওঠানামা চলতো। এই ওঠানামা দিয়ে গাড়ির চাকার চলার সাথে সাথে তাতে সওয়ার যুবতী নারীর ভয় পাবার বিষয়টি বুঝানো হতো। যখন কোনো লোক এবং তার বাচ্চা ঘোড়া ছুটিয়ে চলছে এমন দৃশ্য বুঝানো হতো তখন পিয়ানো সঙ্গত এমভাবে বাজানো হতো যেন ঘোড়া ছুটছে। যখন গলার সুর স্থির পানিতে মাছেদের সাঁতার কেটে বেড়ানোর দৃশ্য তুলে ধরতো তখন পিয়ানোটা নদীতে পরিণত হতো। শুবার্টের গান যতোই শোনা যায় ততোই এইসব সূক্ষ্ণ বিষয়গুলো চোখে ধরা পড়ে।
সদাবৎসল শুবার্ট অসংখ্য পিয়ানো ডুয়েট লিখেছিলেন। এগুলো দুইজন বাজানোর উপযোগী সুর, বলতে গেলে, পিয়ানোতে চারহাতে বাজানোর জন্য লেখা।
ডুয়েট শুনতে খুবই মজা লাগতো। শুধুমাত্র এইজন্যই মানুষজন জড়ো হতো। প্রায়ই ডুয়েট বানানোর সময় শুবার্ট ইচ্ছা করেই এমনভাবে তৈরি করতেন যাতে বাদককে এক হাত ডিঙিয়ে আরেক হাত দিয়ে বাজাতে হয়। আর তারপর তিনি সেগুলো একসাথে বাজানোর জন্য কোনো সুন্দরী পিয়ানো বাদককে ডেকে আনতেন। বাকিটা অনুমেয়।
বেটোভেনের কফিন বয়ে নিয়ে যাবার এক বছরের মাথায় শুবার্ট মারা গেলেন টাইফয়েডে। মাত্র একত্রিশ বছর বয়সে, নিঃস্ব অবস্থায়।
শুবার্টের উল্লেখযোগ্য কাজগুলো হল:
●সিম্ফোনি নম্বর ৪,৫,৮ এবং ৯
●Mass (for solo singers, chorus, and orchestra) no. 5 in A‐flat major, D. 678
●Quintet, opus 114 (The Trout)
●The Shepherd on the Rock, song cycle for soprano, clarinet, and piano
●Die schöne Müllerin (The Miller’s Beautiful Daughter), song cycle for voice and piano
ফেলিক্স মেন্ডেলসন
ইত্যবসরে, জার্মানিতে আরেক মেধাবী বেড়ে উঠছিলেন। লিখছিলেন চমৎকার সব জিনিসপত্র, অত্যন্ত অল্প বয়সে মৃত্যু হবে বলেই হয়তো। তিনি ফেলিক্স মেন্ডেলসন (১৮০৯-১৮৪৭)।
ফেলিক্স জন্মেছিলেন সোনার চামচ মুখে নিয়ে। তাঁর বাবা ছিলেন একজন ব্যাংকার, দাদা ছিলেন দার্শনিক মোজেস মেন্ডেলসন। তাঁর বাবা-মা যখন বুঝতে পেরেছিলেন ফেলিক্সের ভিতরে সহজাত প্রতিভা রয়েছে, তাঁরা তখন তার বিকাশের জন্য চেষ্টা করেছিলেন। মোৎসার্টের মতোই তিনি শিশুকালেই সংগীত রচনা করতে শুরু করেছিলেন, কিন্তু মেন্ডেলসনের সুর শুরু থেকেই অত্যন্ত পরিণত ছিল, বিশেষ করে ষোলো বছর বয়সে লেখা অক্টেট ফর স্ট্রিংস এবং শেকসপিয়রের নাটক আ মিডসামার নাইট’র ড্রিম-এর উপর তৈরি করা একটি ওভারর্চার (সতেরো বছর বয়সে লেখা)।
এর সতেরো বছর পর, মেন্ডেলসন শেকসপিয়রের ওই একই নাটকের জন্য আবহসংগীত তৈরি করেছিলেন। ওই নতুন সংগীতের মধ্যে একটি অংশ মেন্ডেলসনের লেখা যেকোনো সুরের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত। নাটকে ‘আপনি এখন চাইলে কনেকে চুমু খেতে পারেন’ বলার পরে যে ওয়েডিং মার্চের সুরটি বাজে সেটি এতোটাই পরিচিত, মূলধারার সংস্কৃতিতে সেটা এতোটাই মিশে গেছে যে, মাঝে মাঝে মানুষ ভুলে যায় এটা কারও সৃষ্টি!
মোৎসার্টের মতোই, মেন্ডেলসনও তাৎক্ষণিক সুর তৈরি করতে পারতেন যেন আগে থেকেই সেটা তাঁর জানা ছিল। কোনো খসড়াও এজন্য তৈরি করতে হতো না তাঁর। হয়তো তিনি কোনো শিল্পী বন্ধুর সাথে কথা বলছেন তার মধ্যেই হঠাৎ কাগজে সুর লিখতে শুরু করে দিলেন।
নাছোড়বান্দা পিয়ানো
মেন্ডেলসন এক বিরল সংগীতকার যিনি জীবদ্দশাতেই নাম এবং অর্থ দুটোই অর্জন করেছিলেন। যেমন: তাঁর পিয়ানো কনসার্টো নং.১ ইন জি মাইনর এতোই জনপ্রিয় হয়েছিল যে, বেশ কিছুদিনের জন্য এটা সবচেয়ে বেশীবার বাজানো পিয়ানো কনসার্টো হয়ে গিয়েছিলো। এমনকি, সংগীতকার হেক্টর বার্লিওজ এই বাজনাটির কথা প্যারিস কনজার্ভেটরিতে গল্প করেছিলেন। যে পিয়ানোটা দিয়ে ওই কনসার্টোটা বাজানো হতো সেটি নিয়ে একটা মজার গল্প প্রচলিত আছে। ওই পিয়ানোটা নাকি কখনো থামতো না, আপনাআপনি ওই কনসার্টো বাজিয়ে যেতো! তাই স্থানীয় পিয়ানো কারিগরেরা নাকি ওটাকে নিয়ে এসে থামানোর সবরকম চেষ্টা করেছিলেন। পবিত্র পানি ছিটিয়ে দিয়ে, জানালা দিয়ে ফেলে দিয়ে, কুপিয়ে পিয়ানোর চাবিগুলো টুকরা করার পরেও নাকি পিয়ানোটা বেজেই চলেছিলো। পরে বিষয়টা আয়ত্তের বাইরে চলে গেলে মেন্ডেলসন নাকি ওই পিয়ানোর অবশিষ্টাংশ আগুনে ছুঁড়ে দিয়েছিলেন আর তারপরেই নাকি সেই বাজনা থেমেছিলো।
বাখ পুনরাবিষ্কার
ইহুদী পরিবারে জন্ম হলেও, মেন্ডেলসন একজন লুথারান হিসেবে ব্যাপটাইজ হন এবং তিনি ধর্মীয় বিষয়াদী নিয়েও অনেক সংগীত রচনা করেছিলেন।
বড় হয়ে মেন্ডেলসন জার্মানির লিপজিগে অর্কেস্ট্রা পরিচালনা করতেন। সেখানে এক শতাব্দী আগে বাখও তাঁর বিখ্যাত সব সুর রচনা করেছিলেন। সত্যি বলতে বাখের সংগীতকে জনপ্রিয় করতে মেন্ডেলসন একটা বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। আপনাদের মনে আছে নিশ্চয়ই, বাখ বিখ্যাত ছিলেন একজন অর্গান-বাদক হিসেবে, সংগীতকার হিসেবে নয়। তাঁর অসংখ্য সংগীত তাঁর মৃত্যুর পর ঘরের কোণে পড়ে ছিল।
ফেলিক্স মেন্ডেলসন সেসব খুঁজে বের করেন এবং বাখের মৃত্যুর পর প্রথমবারের মত বাখের স্মৃতিসৌধ সেন্ট ম্যাথু প্যাশনের সামনে সেসব পরিবেশন করেন। সেই সময় থেকে বাখকে আবার নতুন করে চিনতে শুরু করে মানুষ এবং সারা পৃথিবীব্যাপী মানুষ তাঁর প্রশংসা করতে এবং ভালোবাসতে শুরু করে।
মেন্ডেলসন বাখ এবং হ্যান্ডেলের পরম্পরা তাঁর নিজের ওরাটরিওতে রক্ষা করেছেন, বিশেষ করে এলিয়াহ এবং হাইম অফ প্রেইজে। কিন্তু মেন্ডেলসনের সিম্ফোনিগুলো তাঁর ওরাটরিওর থেকেও বেশী বিখ্যাত। বিশেষ করে তাঁর চতুর্থ সিম্ফোনি দ্য ইতালিয়ান। এটায় মেন্ডেলসন ইতালির গ্রামীণ অঞ্চলে ভ্রমণ করার সময় যে খোলা, উৎসবমুখর পরিবেশ দেখেছেন সেটি ফুটিয়ে তুলেছেন।
মেন্ডেলসনের এই অসাধারণ সৃষ্টিগুলো শোনা যেতে পারে:
●Piano Concerto no. 1 in G minor, opus 25
●Violin Concerto in E minor, opus 64
●Overture and Incidental Music to A Midsummer Night’s Dream
●Fingal’s Cave Overture
●Elijah, an oratorio for solo singers, chorus, and orchestra
আমরা আগে একবার বলেছিলাম বাখ ছিলেন সর্বকালের সেরা সংগীতকার। তবে অনেকেই মনে করেন মোৎসার্ট (১৭৫৬-১৭৯১) হলেন সর্বশ্রেষ্ঠ। একেবারে শৈশবকাল থেকেই মোৎসার্টের মধ্যে যে সহজাত সংগীত প্রতিভা দেখা গিয়েছিল তার কোনো তুলনা আজও নাই।
উলফগ্যাঙের বাবা, লিওপল্ডও ছিলেন একজন সম্মানীত সংগীতকার এবং সংগীতজ্ঞ। কিন্তু তিনি তাঁর নিজের সম্ভাবনাময় সংগীতজীবন উৎসর্গ করেছিলেন তাঁর মেধাবী পুত্রের মেধার বিকাশের জন্য। তিনি তাঁর শিশুপুত্র উলফগ্যাংকে পিয়ানো, বেহালা এবং সংগীত তত্ত্ব পড়িয়েছিলেন অস্ট্রিয়ার সালসবার্গে থাকাকালীন সময়ে।
বাবার পরিচর্যায় থেকে শিশু উলফগ্যাং মাত্র চার বছর বয়সে নিজে কনসার্টো রচনা করেন। এর কিছুকাল পরে, তিনি তাঁর প্রথম সিম্ফোনিও লিখে ফেলেন। এরপর মাত্র এগারো বছর বয়সে তিনি বাস্টিয়ান এবং বাস্টিয়েনে অপেরাটি লেখেন।
সার্কাসের দল
লিওপল্ড যখন তাঁর পুত্রের মেধার ব্যাপারে নিঃসন্দেহ হলেন, তখনই তিনি বাক্সো-প্যাটরা গুটিয়ে শিশু মোৎসার্ট এবং তাঁর বড়বোন নানার্লকে নিয়ে ইউরোপ ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন। তাঁরা সবখানেই গিয়েছিলেন, লিওপল্ড নিজের ছেলেকে প্রচার করতেন এক বৈজ্ঞানিক বিস্ময় হিসেবে। ইংল্যান্ডে তাঁদের একটা পোস্টারে লেখা হয়েছিল ‘বিজ্ঞানপ্রেমীদের বলছি: ইউরোপের সেরা মেধাবী এমনকি নিঃসন্দেহে বলা যায় মানবজাতির সেরা মেধাবী, জার্মান বালক উলফগ্যাং মোৎসার্ট’।
কিবোর্ডে শিশু মোৎসার্ট ইম্প্রোভাইজেশনের জবর খেলা দেখিয়েছিলেন। প্রথমে খুব কঠিন কঠিন সব সুর বাজিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। এরপর কাপড়ের নিচে হাত রেখে বাজিয়েছিলেন যাতে কিবোর্ডের চাবিগুলো দেখা না যায়। নার্নালও হার্পসিকর্ড বাজিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। একসাথে তাঁরা যেন একটা চলন্ত সার্কাস ছিলেন।
ঘাড়ধাক্কা খাওয়া
তেরো বছর বয়সে মোৎসার্ট সালসবার্গের আর্চবিশপের কোর্টে একটা চাকরি পান যেখানে তিনি বারো বছর কাজ করেছিলেন। সবসময় আরও ভালো কাজের আশায় তাঁর এদিক-ওদিক ছুটে বেড়ানো দেখতে দেখতে আর্চবিশপ বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলেন। অবশেষে, একদিন আর্চবিশপ মোৎসার্টকে চাকরিচ্যূত করেন। আর্চবিশপের সহকারী মোৎসার্টকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দেন।
মোৎসার্ট ভাগ্যান্বেষনের জন্য ভিয়েনা চলে আসেন। তিনি জানতেন ভিয়েনা হলো ইউরোপের সংগীত ভুবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর। তিনি সেখানে শিশু প্রতিভা হিসেবে বাজিয়ে বেশ সফলও হয়েছিলেন একসময়। কিন্তু ততোদিনে মোৎসার্ট তো আর শিশু প্রতিভা নন, তিনি তখন বড় হয়েছেন। কাজেই তাঁর কাজ খুঁজে পেতে বেশ বেগ পেতে হলো। রাজদরবারের গানের ধরন-ধারণ পাল্টে গিয়েছিলো এবং তখন রাজকীয় ফরমায়েশও খুব কমই পাওয়া যেতো। কিন্তু মোৎসার্ট অন্য আরেকজনকে খুঁজে পেলেন: জোসেফ হাইডেন।
বাবা হাইডেন মোৎসার্টকে প্রথম দেখাতেই পছন্দ করে ফেললেন এবং তাঁদের বন্ধুত্ব চিরদিন ছিলো। মোৎসার্ট তাঁর গুরুকে উৎসর্গ করে একটা স্ট্রিং কোয়ার্টেট বানালে হাইডেন উচ্ছ্বসিত হয়ে মোৎসার্টের বাবা লিওপল্ডকে বলেছিলেন, ‘ঈশ্বরকে সাক্ষী মেনে এবং একজন সৎ মানুষ হিসেবে বলছি, আপনার পুত্র একদিন পৃথিবীর সেরা সংগীতকার হবে।’
জীবিকার সুযোগ
কোনো স্থায়ী চাকরি না থাকার কারণে মোৎসার্ট ভিয়েনায় অপেরা লিখে কোনোরকমে পেট চালাতে লাগলেন। এইসব অপেরা আজও জনপ্রিয় এবং চলচ্চিত্রেও বহুলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।
আমেদিউস চলচ্চিত্রে আমরা দেখেছি মোৎসার্টের মেধা দেখে তাঁর প্রতিপক্ষরা কেমন হিংসায় জ্বলতো। সুর তাঁর মাথায় সবসময় ঘুরঘুর করতো আর এমনভাবে সেগুলো তিনি লিখতেন যেন সব আগে থেকেই তাঁর জানা ছিলো।
এইসময় মোৎসার্ট এক সুশ্রী নারীর প্রেমে পড়েন। তাঁর নাম এলোসিয়া ওয়েবার। কিন্তু তিনি তাঁকে প্রত্যাখ্যান করলে, মোৎসার্ট এলোসিয়ারই ছোটবোন কন্সটান্সের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েন এবং তাঁকেই বিয়ে করেন। বিয়ের সম্মানে মোৎসার্ট তাঁর বিখ্যাত সি-মাইনর মাস্ লেখেন।
মোৎসার্টের মর্ম না বোঝাদের মধ্যে শুধু এলোসিয়াই ছিলেন না। ভিয়েনার খামখেয়ালী জনগণও তাঁকে স্রেফ শনিবার রাতের বিনোদনের খোরাক হিসেবেই ধরে নিয়েছিলো।
মোৎসার্ট যেবার প্রাগে গেলেন তখন তাঁর একটু ভাগ্য ফিরতে আরম্ভ করলো। পুরো শহর তাঁর দ্য ম্যারেজ অফ ফিগারো অপেরায় পাগল হয়ে গেল। সেটার সাফল্যের এক বছর পর, ১৭৮৭ সালে প্রাগ শহর তাঁর উপর রাজার ভাগ্নীর বিয়ের সংগীত লেখার দায়িত্ব দিলো। আর তিনি সেই পবিত্র বন্ধন উদযাপনের জন্য কোনো গল্পটিকে সংগীতে রূপ দিবেন বলে বেছে নিয়েছিলেন জানেন? ডন হুয়ানের গল্প, যে কিনা এক যৌন বিকারগ্রস্থ লোক। অপেরাটির নাম ছিল ডন জিওভান্নি। এবং সেটা ছিলো একটা তুমুল জনপ্রিয় অপেরা।
মোৎসার্টের গতিময়তা
সংগীত রচনার গতি নিয়ে মোৎসার্টের সম্পর্কে নানা ধরনের গল্প প্রচলিত আছে। যেমন: দেখা গেল একজন ভিক্ষুক তাঁর সামনে দিয়ে যাচ্ছে অথচ তাঁর পকেটে টাকা নাই যে ভিক্ষা দিবেন। কোনো সমস্যা নাই, মুহূর্তেই একটা কাগজ নিয়ে তার উপরে স্টাফ লাইন এঁকে লিখে ফেললেন একটা মিনুয়েট বা ট্রায়ো। তারপর সেই সুরটা ভিক্ষুককে দিয়ে তাকে পাঠিয়ে দিলেন প্রকাশকের কাছে। আর প্রকাশকও সেটা তখনি কিনে নিয়ে কিছু পয়সা ধরিয়ে দিলো ভিক্ষুকের হাতে।
মোৎসার্টের চঞ্চল ব্যক্তিত্বের সঙ্গে এইরকম গতিময়তাই যেন মানানসই ছিল। কথার মাঝখানেই কখনো তিনি হোহো করে হেসে উঠতেন কিংবা লাফালাফি করে বেড়াতেন, ডিগবাজি খেতেন এমনকি উঁচু টেবিল বা চেয়ারে লাফিয়ে উঠতেন।
হেইডেনের সঙ্গে বিচ্ছেদ
সেইসময় তিনি তাঁর বন্ধু এবং গুরু জোসেফ হেইডেনের সংস্পর্শেই বেশী থাকতেন। ১৭৯০ সালে যখন হেইডেন আটান্ন বছরের বুড়ো এবং মোৎসার্টের বয়স সবে চৌত্রিশ। তখন তাঁরা প্রায় সারাদিনই একসাথে কাটাতেন। রাতের খাবারের পরে যখন বাড়ি যাবার সময় হতো, মোৎসার্ট প্রায়ই হেইডেনকে বলতেন’ ‘এই বিদায়ই বোধহয় শেষ বিদায়।’
তিনি ঠিকই বলতেন। এর এক বছরের মাথায় মোৎসার্ট মারা গেলেন।
পঁয়ত্রিশ বছরের জীবনাবসানের এক বছর পর গুজব ছড়ালো যে হিংসুক সংগীতকার এন্টোনিও স্যালিয়েরিই নাকি মোৎসার্টকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলেছেন। তবে, কথাটির কোনো সত্যতা পাওয়া যায় না। মোৎসার্ট সম্ভবত শারীরিক দুর্বলতার কারণেই মারা গিয়েছিলেন।
মোৎসার্টের সর্বশেষ সংগীতটি ছিল রিকোয়েম, যেটির ফরমায়েশ তিনি এক অচেনা আগন্তুকের কাছ থেকে পেয়েছিলেন। সে যাহোক, শুরু থেকেই মোৎসার্ট বুঝতে পেরেছিলেন যে রিকোয়েমটি তিনি তাঁর নিজের মৃত্যু উপলক্ষ্যেই লিখছিলেন। তিনি জিনিসটা শেষ করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিলেন যা কেবল তাঁর অসুস্থতাকেই আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। শেষমেশ, তিনি শুধুমাত্র কয়েকটা মুভমেন্ট আর পুরোটার একটা কাঠামো দাঁড় করিয়ে যেতে পেরেছিলেন। মোৎসার্টের ছাত্র ফ্রাঞ্জ সস্যুমেয়ার তাঁর মৃত্যুর পরে এই সুর সম্পন্ন করেন। এই সংস্করণটিই এখন বেশীরভাগ জায়গায় শোনা যায়।
মোৎসার্টের মৃত্যুর পরে এই দুনিয়া আর তাঁর মতো দুর্লভ সংগীত প্রতিভা আর দেখেনি। তাঁর সংগীত করার দক্ষতা এবং ঐশী অনুপ্রেরণা আর কারও মাঝে দেখা যায়নি। তাঁর সংগীত স্বয়ং ক্লাসিকাল ধারার মূল নির্যাস যেন। সেগুলো একইসাথে সুরুচিপূর্ণ, কমনীয়, খাঁটি, উদ্যমপূর্ণ এবং সংযত আবেগ সম্পন্ন, তবে এর মধ্যে আছে নিগূঢ় কোনো বোধ।
মোৎসার্টের কোনো 'কম-ভালো' সংগীত নাই। তাই মোৎসার্ট শোনা যেতে পারে চোখ বুঁজে, তাঁর যেকোনো সুর, যেকোনো সময়। কাজেই, মোৎসার্টের সংগীতের সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করা একটা দূরূহ ব্যাপার। তবে এই সুরগুলোর কথা উল্লেখ না করলেই নয়:
●Clarinet Concerto in A major, K. 622
●Piano Concerto no. 22 in E‐flat major, K. 482
●Piano Concerto no. 24 in C minor, K. 491
●Violin Concerto no. 5 in A major (Turkish), K. 219
●Sinfonia Concertante (concerto for violin and viola) in E‐flat major, K. 364
●Symphony no. 38 in D major (Prague), K. 504
●Requiem (completed by Franz Süssmayr), K. 626
●Piano Sonata in G major, K. 283
●Piano Sonata in F major, K. 332
●Serenade in G major for Strings (Eine kleine Nachtmusik — or A Little Night Music), K. 525
●Serenade no. 6 in D major (Serenata notturna — or Nocturnal Serenade), K. 239
লুডউইগ ভ্যান বেটোভেন
লুডউইগ ভ্যান বেটোভেন (১৭৭০-১৮২৭) ধ্রুপদী সংগীতের ইতিহাসকে যতোটা প্রভাবিত করতে পেরেছিলেন ততোটা মোৎসার্টও পারেননি। জার্মানির বন শহরে জন্ম। বেটোভেন ছিলেন কোর্ট মিউজিশিয়ান জোহানের পুত্র। মোৎসার্টের বাবার মতো, জোহানও তাঁর পুত্রকে শিশু মেধাবীতে পরিণত করার চেষ্টা করেছিলেন। তবে মোৎসার্টের বাবার পদ্ধতিতে নয়, জোহান ছিলেন আরও রূঢ়। তিনি যখনই বেটোভেনের মধ্যে আলসেমি দেখতেন সঙ্গে সঙ্গে মারধোর করতেন। এই অত্যাচারের পরেও বেটোভেন একজন অসামান্য পিয়ানোবাদক হয়ে উঠেছিলেন।
বাইশ বছর বয়সে বেটোভেন ভিয়েনায় যান। সেখানে তিনি বিভিন্ন ফরমায়েশি সুর বাঁধতেন, বিশেষ বিশেষ উপলক্ষ্য এবং কনসার্টগুলোতে তিনি নিজের সুর বাজাতেন। এইভাবে তিনি অবশ্য মোৎসার্টের থেকে ভালো কামাই করতেন।
বেটোভেন নিজে এবং তাঁর সুর, দুটোই ছিল টগবগে, আবেগতাড়িত এবং দ্রুতগামী। তাঁর মন দিয়ে পিয়ানো বাজানো দেখে লোকেরা খুবই আনন্দ পেতো। তবে, মঞ্চের বাইরে তাঁর চঞ্চল স্বভাবের জন্য বাড়িওয়ালা এবং প্রেমিকাদের সঙ্গে ঝগড়া লেগে যেতো। বেটোভেনের কোনোকিছুই বেশীদিন ভাল লাগতো না, সেটা বাসস্থানই হোক কিংবা নারী। এইরকম চরিত্রগুলোর সাথে আমরা অবশ্য সবাই কমবেশী পরিচিত: মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও যাদের বাগে রাখা কঠিন।
বাবা হেইডেনের কাছে দীক্ষা
তবে বেটোভেনের ভিয়েনা গমনের আসল উদ্দেশ্য ছিল জোসেফ হেইডেনের কাছে সংগীত শেখা। এই ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের পরিণতিও অবশ্য বেটোভেনের আর দশটা সম্পর্কের থেকে ব্যতিক্রম কিছু হয়নি, তবুও, হেইডেন তাঁর এই বেয়াড়া ছাত্রকে অসম্ভব মেধার জন্য সবসময়ই প্রশ্রয় দিয়ে গেছেন।
মোৎসার্টের মত বেটোভেনও দুটো জিনিসই শিখেছিলেন, কেমন করে সিম্ফোনি এবং স্ট্রিং কোয়ার্টেট লিখতে হয় ‒ হেইডেনের দুই ব্রহ্মাস্ত্র। আসলে, বেটোভেনের প্রথম দুটি সিম্ফোনিতে হেইডেনের প্রভাব ছিল স্পষ্ট। কাঠামো, গঠন এবং দৈর্ঘ্য, সবদিক দিয়েই সেগুলো যেন প্রায় হেইডেনেরই সিম্ফোনি বলে মনে হয়।
কিন্তু একটা ঘটনা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। একত্রিশ বছর বয়সে তিনি বুঝতে পারলেন যে তিনি আস্তে আস্তে শ্রবণশক্তি হারাচ্ছেন। যেকোনো সংগীতশিল্পীর কাছেই এরচেয়ে খারাপ সংবাদ আর হতে পারে না। ধেয়ে আসা বধিরতা বেটোভেনের উপর হতাশা নিয়ে চেপে ধরলো।
একদিন, বেটোভেন তাঁর বন্ধু এবং ছাত্র ফার্দিনানদ রাইজকে সঙ্গে নিয়ে রাস্তা ধরে যাচ্ছিলেন। এমন সময় রাইজ দূর থেকে ভেসে আসা রাখালের বাঁশির একটা মিষ্টি সুর শুনতে পেলেন। কিন্তু বেটোভেন কিচ্ছু শুনতে পাননি। এই ঘটনায় তিনি যারপরনাই ভেঙ্গে পড়েন। তিনি পরবর্তীতে তাঁর এই দুঃখের কথা একটা কাগজে লিখেছিলেন, যেটা একইসাথে হৃদয় বিদারক এবং সাহসী। এই কাগজটি এখন শিল্পীদের কাছে হেলিজেনস্টাড টেস্টামেন্ট নামে পরিচিত:
ওহ, মানুষ, তোমরা যারা ভাবো এবং বলো যে আমি বদলোক বা অসামাজিক, কি নিদারুণ ভুলটাই না করো তোমরা। তোমরা এর পেছনের রহস্যটা জানোনা…..ছয় বছর হয়ে গেল, আমি এই কষ্টের মধ্যে আছি...আহ, কেমন করে আমি আমার এই স্নায়ুর দুর্বলতা সবাইকে বলবো যা কিনা অন্যদের চেয়ে আমারই সবচেয়ে সবল হবার কথা ছিলো, যে অনুভূতিকে একসময় আমি পরম যত্নে লালন করেছি? ওহ, আমি পারবো না; কাজেই যখন তোমার সাথে দুই দন্ড হেসে কথা বলার কথা তখনই যদি আমাকে ঘরের কোণে লুকিয়ে থাকতে দেখো, আমায় ক্ষমা করে দিও….আমাকে একা থাকতে হবে, ধরে নিও যেন আমি আর কোথাও নেই।
বেটোভেনের জীবনের এই সময়ের সংগীতগুলোতে এক বেপরোয়া লোকের আত্মনিয়ন্ত্রণের তুমুল প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়। যদি আমরা তাঁর সময়টিকে অনুভব করতে পারি, তাহলে আমাদের কাছে তাঁর সংগীতও আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। নিজের ব্যথা প্রকাশ করতে গিয়ে বেটোভেন একা হাতে পুরো ক্লাসিকাল যুগকে এগিয়ে নিয়ে রোমান্টিক যুগের সূচনা করেছিলেন, যে যুগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যটি হল অনুভূতি প্রকাশের প্রচেষ্টা।
যদি এমন একটা সুরের কথাও চিন্তা করতে হয় যেটা সংগীতের ইতিহাসে বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছে, তাহলে সেটা বেটোভেনের সিম্ফোনি নম্বর ৩, যা ইরোইকা সিম্ফোনি (মানে হিরোইক সিম্ফোনি) নামেও পরিচিত। এই সুরটির জন্য বেটোভেনের কপাল থেকে হাইডেন আর মোৎসার্টের অনুকরণকারীর খেতাব ঘুচে যায় এবং তাঁর স্বাতন্ত্র্য ফুটে ওঠে।
শুরু থেকেই বেটোভেন এই সিম্ফোনিটাকে একটা বিরাট বড় অধিক্ষেত্রের মধ্যে বসিয়েছিলেন, তাঁর উদ্দেশ্যটা ছিল এক বিখ্যাত বীরের জীবন এবং মৃত্যুকে ফুটিয়ে তোলা। আসলে, সেই বীরটি ছিলেন নেপোলিয়ন বোনাপার্ট, কিন্তু ১৮০৪ সালে তিনি সেই চিন্তা থেকে সরে আসেন। বেটোভেনের বন্ধু ফার্দিনান্দ রাইজ এই ব্যাপারে লিখেছিলেন:
সেই সময় বেটোভেন বোনাপার্টের খুব প্রশংসা করতেন। আমি এই স্বরলিপিটা টেবিলের উপর পড়ে থাকতে দেখেছিলাম। তার শিরোনামে লেখা ছিল ‘বোনাপার্ট’ এবং শেষে লেখা ছিল ‘লুইগি ভ্যান বেটোভেন’। এছাড়া আর কোনোকিছু লেখা ছিল না….
আমিই প্রথম তাঁকে জানাই যে বোনাপার্ট নিজেকে রাজা হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি প্রচন্ড রেগে যান এবং চিৎকার করে বলেন: ‘তারমানে সেও সাধারণ মানুষের চেয়ে বড়কিছু নয়? এখন তো সেও মানুষের অধিকারে হস্তক্ষেপ করবে আর তার নিজের আখের গোছাতে শুরু করবে। সেও স্বৈরাচারী শাসকে পরিণত হবে!’ বেটোভেন তাঁর স্বরলিপির শিরোনামটি ছিঁড়ে ফেলেন এবং মেঝেতে ফেলে দেন। প্রথম পাতাটি পরে আবার লেখা হয়েছিল, আর তখন সেটার নাম হয়েছিলো শুধুমাত্র সিম্ফোনিয়া ইরোইকা বা হিরোইক সিম্ফোনি।
এর আগের সাধারণ যত সিম্ফোনি তার চেয়ে এই সিম্ফোনিটি ছিল দ্বিগুণ লম্বা এবং এর ভিতরকার আনুপাতিক দৈর্ঘ্যেও আসে বিরাট পরিবর্তন। বিশেষ করে ঢিমে লয়ের দ্বিতীয় মুভমেন্টটা একটু বেশীই অন্যরকম, যেন বিষন্ন শবযাত্রা, সঙ্গে ভয়াবহ শোক আর কষ্টের আবেগময় প্রকাশ।
বেটোভেন সর্বমোট নয়টি সিম্ফোনি লিখেছিলেন। প্রতিটিই সিম্ফোনিই বিদ্যমান সকল সিম্ফোনির গঠনকে চ্যালেঞ্জ করেছিলো এবং সিম্ফোনির গঠনের কলেবর বহুদূর এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলো। প্রতিটা কাজেই তিনি যেন আগের কাজকেও ছাড়িয়ে গেছেন, তাঁর সংগীত যেন আরও অনুভূতি প্রকাশে সক্ষম এবং ঋজু হয়ে উঠেছিলো যা ছিলো এক অভূতপূর্ব ঘটনা।
পঞ্চম সিম্ফোনি
নিঃসন্দেহে বেটোভেনের সবচেয়ে বিখ্যাত সিম্ফোনি হল পঞ্চম সিম্ফোনি। এই সিম্ফোনিটি কাঠখোট্টা সি-মাইনর কি-তে শুরু হয়, যার সঙ্গে রয়েছে সেই অতি বিখ্যাত চার-নোটের টুকরা: ‘ডা-ডা-ডা-ডাআআআআআআআআআআ!’
চারটা মুভমেন্ট জুড়ে নানান বিপজ্জনক কসরত দেখানোর পর সিম্ফোনিটি শেষ হয়। তবে তা সি-মাইনরে শেষ না করে বেটোভেন বরং বেছে নেন স্বস্তিদায়ক, বিজয়ী এবং উচ্ছ্বসিত সি-মেজর কি।
সাংগীতিকভাবে চিন্তা করলে, মাইনর কর্ড এবং মেজর কর্ডের মধ্যে পার্থক্য শুধুমাত্র একটা স্বরের। কিন্তু, আবেগের নিক্তিতে মাপলে, এই পার্থক্যটা বিরাট। যদি মাইনর থেকে মেজরে যাওয়া যায়, তাহলে মনে হয় যেন ঝড় শেষ হলো, মেঘ সরে গেল, সূর্য চিকমিক করে উঠলো আর হালে যেন পানি এলো। পুরো বিষয়টা বুঝতে গেলে অবশ্যই পঞ্চম সিম্ফোনির পুরোটা মন দিয়ে শুনতে হবে।
শেষ সিম্ফোনি
মোৎসার্টের মত বেটোভেন সহজাত সংগীতকার ছিলেন না। তাঁকে তাঁর সংগীতের খেরোখাতা নিয়ে সুরের সঙ্গে রীতিমতো কুস্তি করতে দেখা যেতো এবং মাসের পর মাস চলে যেতো তিনি তাঁর সুর নিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারতেন না।
একটা খুব সাধারণ সুর বেটোভেনের খেরোখাতায় ঢুকে ইতিহাসের এক মহান সুর হয়ে বেরিয়ে এসেছিল: ‘ওড টু জয়’। এটাই হলো তার সর্বশেষ নবম সিম্ফোনির থিম। আমরা প্রত্যেকেই সম্ভবত এই সুরটা কমবেশী শুনেছি।
‘ওড টু জয়’ হল ফ্রেডরিখ শিলারের একটা দীর্ঘ এবং চমৎকার কবিতা। তেইশ বছর বয়স থেকেই বেটোভেনের মাথায় এটার উপর সুরারোপের চিন্তা ছিলো। বিশ বছর পর তিনি এটাকে ব্যবহার করার সঠিক জায়গাটি খুঁজে পান, নবম সিম্ফোনির শেষ মুভমেন্ট।
ততদিন পর্যন্ত দুনিয়া যত সিম্ফোনি তৈরি হয়েছিলো প্রত্যেকটিই শুধুমাত্র অর্কেস্ট্রার সাথে বাজানোর উপযোগী করে তৈরি হয়েছিলো। কিন্তু এই নবম সিম্ফোনিতে বেটোভেন প্রথমবারের মত সিম্ফোনিতে গানের বাণী যুক্ত করেন। শিলারের কবিতাটা গাইবার জন্য তিনি চারজন গায়ককে নিযুক্ত করেন এবং সঙ্গে জুড়ে দেন এক বিরাট কোরাস দল। সেই সময়ের সংগীত সমালোচকদের কাছে সিম্ফোনিতে কণ্ঠ যুক্ত করা ছিল দেশদ্রোহীতার সামিল। এই নিয়ে বিতর্ক চলেছে কয়েক দশক।
সৌভাগ্যবশত, মানুষ এইসব সমালোচকদের বিশেষ পাত্তা দিতো না। তাই, এর প্রথম পরিবেশনাটি সাফল্যের মুখ দেখেছিলো। বাজনা শেষে দর্শক উঠে দাঁড়িয়ে বেটোভেনকে সম্মান জানিয়েছিলো। কিন্তু, ততোদিনে বেটোভেন সম্পূর্ণ বধির হয়ে গেছেন। তিনি দর্শকদের কাজকর্ম কিছুই টের পেলেন না, অর্কেস্ট্রার দিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। একজন গায়ক দয়াপরবশত এগিয়ে এসে বেটোভেনকে ধরে দর্শকের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন।
বেটোভেন একজন বীরের বেশে মারা যান। তাঁর শেষকৃত্যে ত্রিশ হাজার মানুষ সামিল হয়েছিলো। তাঁর কফিন বহনকারীদের মধ্যে একজন ছিলেন ফ্রাঞ্জ শুবার্ট। তাঁর সম্পর্কেই আমরা সামনের অধ্যায়ে জানব।
বেটোভেনের সেরা সংগীত বাছাই করাও দুরূহ কাজ। তবে, এইগুলো না শুনলেই নয়:
●সবগুলো সিম্ফোনি (১ থেকে ৯ নম্বর পর্যন্ত)
●Piano Concerto no. 4 in G major, opus 58
●Piano Concerto no. 5 in E‐flat major, opus 73
●Violin Concerto in D major, opus 61
●Piano Sonata no. 14 in C‐sharp minor, opus 27, no. 2 (Moonlight)
●Piano Sonata no. 8 in C minor, opus 13 (Pathétique)
●Piano Sonata no. 23 in F minor, opus 57 (Appassionata)
●Sonata for Violin and Piano no. 9 in A major, opus 47 (Kreutzer)
●Trio in B‐flat major for Clarinet (or Violin), Cello, and Piano, opus 11
●String Quartets opus 59, no. 1‐3 (the Razumovsky Quartets)
বেশীরভাগ সংগীতকারই জোহান সেবাস্টিয়ান বাখকে (১৬৮৫-১৭৫০) পৃথিবীর অন্যতম সেরা সংগীতকারদের একজন বলে মানেন। আর, কেউ কেউ মনে করেন তিনিই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সংগীতকার। কারণটা শুধুই এটাই নয় যে তাঁর সবগুলো সংগীতই অনন্য, বরং, তাঁর পরবর্তী সকল সংগীতকারই তাঁর কাছে কোনো না কোনোভাবে ঋণী।
বাখ কোর্ট মিউজিশিয়ান হিসেবে প্রথম কাজটি পান জার্মানির ওয়েমার শহরে। সেখানে থাকাকালীন তিনি দুর্দান্ত কিছু অর্গান পিস তৈরি করেন যেগুলো আজও সমাদৃত।
এই সুরগুলো এখনও এতোটা সমাদৃত হওয়ার পেছনে দুটো কারণ আছে: প্রথমত, সেই যুগে কোনো সংগীতই দীর্ঘদিন টিকে থাকার কথা মাথায় রেখে রচনা করা হতো না। সংগীতকারেরা কোনো নির্দিষ্ট উপলক্ষ্যকে সামনে রেখেই সংগীত তৈরি করতেন এবং সেটা যে আবার কখনো বাজানো হতে পারে সেই কথা মাথাতেও তাঁদের থাকত না। বাখের কিছু অসাধারণ সোনাটার স্বরলিপি ঠিক মাছ বাজারে মাছের প্যাকেট হিসেবে ব্যবহার হয়ে যাওয়ার আগমুহূর্তে উদ্ধার করা গিয়েছিল।
আর দ্বিতীয়ত, মানুষের নতুনকে গ্রহণ করার ব্যাপারে যে অনীহা আজও দেখা যায়, সেই অনীহার কারণে তখন বেশীরভাগ সংগীতকার এবং শিল্পীরা তাঁদের জীবদ্দশাতে অচেনাই থেকে যেতেন। তবে, বাখ সেদিক থেকে ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি ছিলেন সুপিরিচিত, বলা যায় সম্মানের পাত্র। তবে, তিনি পরিচিত ছিলেন অর্গান বাদক হিসেবে, কোনো সংগীতকার হিসেবে নয়।
অর্গানমেইস্টার বাখ
বাখ ছিলেন পৃথিবীর অন্যতম দক্ষ অর্গান বাদক। শুধুমাত্র তাঁর আঙ্গুলগুলোই দ্রুত চলতো না, তাঁর পা দুটোও চলতো সমান তালে। কয়েক মাইল দূর থেকেও মানুষ বাখকে দেখতে আসতো, তারা জানতো লোকটির অসম্ভব দ্রুত পায়ের ব্যাপারেও।
বাখ একজন দক্ষ ইম্প্রোভাইজারও ছিলেন। তিনি প্রায় যেকোনো সুরের উপরেই নতুন করে সুর আরোপ করতে পারতেন তৎক্ষণাৎ, ঠিক যেমনটা আজকের দিনের প্রাচ্য সংগীতে কিংবা জ্যাজ সংগীতে হয়ে থাকে। তবে দুঃখের কথা হলো, সেসব ইম্প্রোভাইজেশন কেউ লিখে রাখেনি। কাজেই আমরা জানতেও পারবো না বাখের ইম্প্রোভাইজেশন শুনতে কেমন ছিলো।
বাখের আরও গুণ
বাখ সংগীতকার হিসেবেও ছিলেন বিশাল। কারও পক্ষে বাখের সমস্ত সংগীত লিখতে গেলে কয়েক যুগ লেগে যাবে।
কিন্তু, বাখের আরও গুণ ছিলো। দুই স্ত্রীর গর্ভে বাখের ছিলো বিশ সন্তান। তাঁর বেশকিছু সন্তানও সংগীতকার হয়েছিলেন। উইলহেম ফ্রাইডম্যান বাখ, কার্ল ফিলিপ ইমানুয়েল বাখ এবং জোহান ক্রিস্টিয়ান বাখ এঁদের মধ্যে অন্যতম। এরা সবাই বাবাকে তাঁর সুরের প্রতিলিপি তৈরি করতে সাহায্য করতেন।
আটত্রিশ বছর বয়সে বাখ সর্বশেষ চাকরিটি পান। জার্মানির লিপজিগ শহরের সেন্ট থমাস চার্চের ক্যান্টরের পদ। এই কাজেও বাখের অবদান বিশাল। তিনি প্রতিটা রবিবারের প্রার্থনার জন্য একটা করে নতুন এবং বড় ক্যানটাটা বা বৃন্দ গান তৈরি করতেন। এভাবে তিনি টানা তিন বছর করেছেন। সর্বমোট ২১৫টা ক্যানটাটা তিনি লিখেছিলেন।
বাখের সংগীত ছিলো কাউন্টারপয়েন্টে ভরা। কাউন্টারপয়েন্ট হলো দুই, তিন, চার বা তারও বেশী সুর একসাথে বাজানোর কৌশল। এভাবে বাজালে মজার হারমোনি তৈরি হয়। তিনি ফ্যুগ ধারাটিকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। ফ্যুগ অত্যন্ত জটিল একটা ধারা যেখানে একইসাথে সর্বোচ্চ চারটা সুর বাজতে থাকে। বিশেষত কণ্ঠ সংগীতের জন্যই এটি বানানো হয়ে থাকে। ফ্যুগে প্রতিটা সুরই একই রকমের কিন্তু কোনোটাই একসাথে শুরু হয় না। একটা শুরু হবার কিছু সময় পরে আরেকটা সুর শুরু হয়। বাখের ফ্যুগে সুরের অত্যন্ত জটিল কারুকাজ থাকতো। সেগুলো একেক সময় শুরু হলেও সব মিলিয়ে শুনতে খুবই সুন্দর শোনাতো। বাখের মাথার ভিতরটাও ছিলো এইরকমই, তাঁর মাথাটা এতোই পরিষ্কার ছিল যে তিনি যেকোনো সুরকে মুহূর্তেই ফ্যুগে রূপান্তর করতে পারতেন।
বাখের কিছু উল্লেখযোগ্য কাজ হল:
●Brandenburg Concertos, no. 1‐6, BWV 1046‐1051
●Magnificat, a sacred oratorio for solo singers, chorus, and orchestra, BWV 243
●The Passion According to St. Matthew, a sacred oratorio for soloists, chorus, and orchestra, BWV 244
●Concerto for Violin, Oboe, and Orchestra in C minor, BWV 1060
●Orchestral Suite no. 3 in D major, BWV 1068
●Concerto for Harpsichord (or piano) in D minor, BWV 1052
ক্লাসিকাল যুগ
জোহান সেবাস্টিয়ান বাখের সংগীত হলো বারোক ঘরানার সর্বোৎকৃষ্ট সংগীত, এবং তাঁর সাথে সাথেই বারোক যুগেরও পরিসমাপ্তি হয়। এরপরের যুগের নাম হল ক্লাসিকাল যুগ।
ক্লাসিকাল বা ধ্রুপদ সংগীত বলতে আমরা সাধারণত এই আলোচনার সমস্ত সংগীতকেই বলছি। কিন্তু, ক্লাসিকাল যুগ একটি সুনির্দিষ্ট সময়কালকে বুঝায় (১৭০০-এর মাঝামাঝি থেকে ১৮০০ এর শুরুর সময় পর্যন্ত)। আর এই সময়কালের সংগীতকে বলা হয়ে ক্লাসিকাল ঘরানার সংগীত।
ক্লাসিকাল ঘরানা একদিক থেকে দেখলে বলা যায় যেন বারোক ঘরানার প্রতিক্রিয়া। বারোক ঘরানা যেমন নকশাদার, বেপরোয়া এবং আবেগপ্রবণ ছিলো, ঠিক তার উল্টোটা হল ক্লাসিকাল ঘরানা। এই সময়ের সংগীত যেন কিছুটা সাধারণ, গম্ভীর এবং সংযত।
ক্লাসিকাল যুগে তিনটি ধারার সংগীত জনপ্রিয় হয়: সোনাটা, সিম্ফোনি এবং স্ট্রিং কোয়ার্টেট। ক্লাসিকাল যুগের তিনজন সেরা সংগীতকার হলেন হাইডেন, মোৎসার্ট এবং বেটোভেন। এই তিন মেধাবীর প্রত্যেকেই প্রত্যেককে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন। তাঁরা সকলেই অস্ট্রিয়ার ভিয়েনাতে জীবনের উল্লেখযোগ্য সময় কাটিয়েছেন। ভিয়েনাকে তখন পাশ্চাত্য সংগীতের রাজধানী বলা হতো।
জোসেফ হাইডেন
জোসেফ হাইডেন (১৭৩২-১৮০৯) ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক, আমুদে এবং রসিক লোক। তিনি অবিরাম মানুষের সাথে ঠাট্টা করে যেতেন, বিভিন্ন বিষয় নিয়ে রসিকতা করতেন; এমনকি নিজেকে নিয়ে ঠাট্টা করতেও তাঁর বাঁধত না। তাঁর গানেও এর পরিচয় পাওয়া যায়।
হাইডেনের জন্ম অস্ট্রিয়ার সীমান্তবর্তী এক গ্রামে। সেখানে ক্রোয়েশিয়া, স্লোভাকিয়া এবং হাঙ্গেরির সীমান্ত ছিলো। বাল্যকালে তিনি অসংখ্য লোকগান শুনেছিলেন এবং একসময় তিনি বুঝতে পারেন যে গানই তাঁর একমাত্র ভালোলাগার জিনিস। তাঁর ছিল অসাধারণ গানের গলা আর আট বছর বয়সেই তিনি ভিয়েনাতে সেন্ট স্টিফেন’স ক্যাথেড্রালের কয়ার দলে যোগ দেবার জন্য মনোনীত হন।
ভিয়েনায় হাইডেনের সাথে তৎকালীন সেরা সব সংগীতের সঙ্গে পরিচয় হয় এবং সেগুলো শুনেই তিনি সংগীতকার হওয়ার জন্য মনস্থির করেন। সোপরানো গায়ক হওয়ার জন্য তিনি প্রায় খোজা হয়ে যাবার উপক্রম থেকে ফিরে এসেছিলেন।
ভিয়েনার সেন্ট স্টিফেন’স ক্যাথেড্রালে হাইডেন ছিলেন বিস্ময়বালক। বয়স বাড়তে থাকলে, তাঁর শিক্ষক তাঁকে বলেন যে, তিনি যদি একটা ‘সামান্য অপারেশন করেন’ তাহলে নাকি তাঁর কণ্ঠ আরও চড়া এবং সুন্দর হবে। এই কথা শুনে বাচ্চা হাইডেন সেই অলৌকিক গলা পাবার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। অপারেশন হবার মাত্র ঘন্টাখানেক আগে তাঁর বাবা তাঁকে উদ্ধার করেন এবং অপারেশন আটকে দেন।
অন্যান্য সংগীতকারদের মতো হাইডেনেরও জীবিকা প্রাথমিকভাবে চলতো রাজার দরবারে শিল্পী হিসেবে কাজ করে। তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন ছিল প্রিন্স এস্টারহাজির প্রাসাদে।
এস্টারহাজির প্রাসাদে
হাইডেনের পদের নাম ছিল সার্ভেন্ট কিন্তু তাঁকে রাজার মত খাতির করা হতো। তাঁর নিজের চাকরানী এবং ফুটম্যান ছিল, সেইসঙ্গে ছিল মোটা বেতন। তিনি দিন কাটাতেন নতুন সুর লিখে আর রাজকুমারকে সেগুলো বাজিয়ে শুনিয়ে। রাজকুমার নিজেও ছিলেন একজন শখের শিল্পী।
এই চাকরিটাই হাইডেনকে বিভিন্ন ধারার গান নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিলো। এস্টারহাজির প্রাসাদে ত্রিশ বছর কাজ করার সময় হাইডেন বলতে গেলে একা হাতে সিম্ফোনি এবং স্ট্রিং কোয়ার্টেটের কাঠামোর প্রমিতকরণ করেন এবং এই কারণেই বেটোভেন এবং অন্যান্যরা তাঁকে ‘বাবা’ বলে ডাকতেন। আজকের দিনেও অনেক সংগীত বিষয়ক লেখক তাঁকে ‘বাবা হাইডেন’ নামে অভিহিত করে থাকেন।
হাইডেনের সংগীত
দ্য সারপ্রাইজ সিম্ফোনি (নম্বর ৯৪) একটা অবশ্য শ্রবণীয় সুর। এটা হাইডেনের অন্যতম সেরা সুর এবং এটা হাইডেনের ধাঁচের সবচেয়ে সুন্দর উদাহরণ। এর পেছনে একটা গল্পও আছে। লন্ডনে কাজ করার সময় হাইডেন দেখলেন যে রাতের খাবারের পর হালকা চালের সুর বাজানোয় তাঁর শ্রোতারা সবাই ঘুমে ঢলে পড়ছে। এর শোধ নিতে তিনি একটা মুভমেন্ট রচনা করলেন যেটা শুরুতে খুবই হালকা চালে চললেও আস্তে আস্তে চড়তে থাকে। সেই অংশটুকু আসতেই সম্পূর্ণ অর্কেস্ট্রা যখন হঠাৎ করে উচ্চস্বরে বেজে উঠতো তখন তাঁর ঢুলুঢুল শ্রোতারাও ধড়মড় করে উঠে বসতেন।
হাইডেনের বয়স বাড়তে শুরু করলে, তিনি বাল্যকালে শোনা লোকগানগুলো থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে তাঁর সংগীতে সেসব প্রয়োগ করতে শুরু করেছিলেন। এর একটা মোক্ষম উদাহরণ হল তাঁর শেষ সিম্ফোনির শেষ মুভমেন্টটি (লন্ডন সিম্ফোনি নম্বর ১০৪)।
জোসেফ হাইডেনের আরও কিছু অসাধারণ অর্কেস্ট্রাল সংগীত হল:
●Trumpet Concerto in E‐flat major, Hob. VIIe:1
●Violin Concerto in G major, Hob. VIIa:4
●Cello Concerto in C major, Hob. VIIb:5
●Lord Nelson Mass, for soloists, chorus, and orchestra, Hob. XXII:11
মন্টেভার্ডি আর তাঁর
অনুসারীরা সংগীতের নতুন যুগের পথ দেখিয়ে দিয়েছিলেন। আজকে তার নাম বারোক যুগ।
বারোক যুগের সময়কাল ১৬০০-এর
মাঝামাঝি থেকে ১৭০০-এর মধ্যকাল পর্যন্ত। এই সময়টা ছিলো নকশাদার আর আবেগ-প্রধান শিল্পকর্মের
কাল, তাই এই সময়ের সংগীতেও ছিল তার প্রভাব। বারোক যুগের শিল্পীরা তাদের শিল্পকর্মে
নানান সূক্ষ্ণনকশা দিয়ে ভরিয়ে তুলতেন।
বৃত্তের বাইরে
যাবার কাল
বারোক সংগীত শোনার সময়
মনে হয় যেন গানগুলো অত্যন্ত আবেগাক্রান্ত। আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে অবশ্য এগুলোকে অপেক্ষাকৃত
সংযত মনে হয়। কিন্তু, সেই সময়, ওইসব নকশাদার সুরের ওঠানামা দেখে সবার মনে হত গান বুঝি
গোল্লায় গেছে। সংগীতকারেরা বিভিন্ন ধরনের কাঠামো নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন, আগেরদিনের
সমস্ত নিয়মকানুন ভেঙে ফেলেছিলেন তাঁরা।
রেনেসাঁ যুগের মাদ্রিগালে
যে ওয়ার্ড-পেইন্টিঙের বিষয়টি জনপ্রিয় হয়েছিল সেটি বারোক যুগে নতুন মাত্রা পায় এবং আরও
ছড়িয়ে যায়। আগে, দীর্ঘশ্বাস বোঝাতে গায়ক হয়তো উচুঁ থেকে নিচু স্বরে নেমে আসতেন। কিন্তু
এইসময় সেই বিষয়টিই বাদ্যযন্ত্র দিয়ে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা শুরু হয়। শ্রোতারা বুঝতে পারতেন
যে সুরের হঠাৎ উচুঁ থেকে নেমে আসা মানে দীর্ঘশ্বাস বোঝাচ্ছে, অথচ, সেইসব গানে কোনো
কথা ছিল না, শুধু ছিল সুর। কথাবিহীন ওয়ার্ড-পেইন্টিং বারোক যুগের সংগীতের আবেগ প্রকাশের
অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
রাজা, চার্চ
এবং অন্যান্য অভিজাতদের ভূমিকা
আপনি আজ থেকে ৩০০ বছর আগের কোনো উঠতি শিল্পী হয়ে থাকলে সেইসময়কার কোনো ক্যারিয়ার
কাউন্সিলর হয়তো
আপনাকে হয়তো তিনটি জায়গায় কাজ খোঁজার জন্য পরামর্শ দিতেন:
রাজার দরবারে, কোনো ধনী লোকের বাড়িতে অথবা কোনো খ্রিস্টান চার্চে।
সব বয়োজ্যেষ্ঠ নামকরা
সংগীতকারেরা তখন এইরকম কাজ করতেন। এদের কারও কারও ভাগ্য আবার অন্যদের চেয়ে একটু বেশীই
ভালো ছিল। কারণ অনেক বিখ্যাত সংগীতকার ছিলেন যাদেরকে দীর্ঘদিন ধনী লোকেদের বাড়িতে গৃহস্থালি
কাজকর্ম করেই কাটাতে হয়েছিল। যেমন: জোসেফ সামারটিনি (আনুমানিক ১৭০০-১৭৭৫) ছিলেন ইতালিয়
ওবোয়িস্ট, পৃথিবীর প্রথমদিককার কিছু সিম্ফোনির সংগীতকার এবং উদীয়মান উলফগ্যাং আমেদিউস
মোৎসার্টের কাছে একজন বিরাট অনুপ্রেরণা। তিনি কী কাজ করতেন জানেন? তিনি প্রিন্স অফ
ওয়েলসের ঘরে গৃহকর্মী প্রধান হিসেবে কাজ করতেন।
এন্টনিও ভিভালডি
বারোক যুগের ইতালিয় তারকা
এন্টনিও ভিভালডি (১৬৭৮-১৭৪১) ক্যাথলিক চার্চে কাজ করতেন। এই লোকটি তাঁর কর্মজীবনে এই
পৃথিবীর যেকোন সংগীতকারের থেকে বেশী সংগীত রচনা করেছেন। তাঁর ৫০টি অপেরা বাদেও রয়েছে
৪০টি অর্কেস্ট্রা-কয়্যার সংগীত। এছাড়া ১০০টি সংগীত শুধুমাত্র অর্কেস্ট্রার জন্যই তিনি
লিখেছিলেন। বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র একা বাজাবার জন্য তিনি প্রায় ৫০০ কনসার্টো রচনা করেছিলেন।
তখনকার দিনের ভিভালডির
হিংসুটে সমালোচকরা বলতেন ভিভালডি নাকি একই জিনিস ৫০০ বার লিখেছিলেন। আজকের দিনেও এদের
দেখতে পাওয়া যায়। একজন মানুষ কোন দুঃখে একই জিনিস ৫০০ বার লিখবেন? এর কোনো ভিত্তি নাই।
তবে, এরা বুঝাতে চান যে, ভিভালডির সংগীতে কোনো নতুনত্ব ছিল না। কিন্তু, ভিভালডির একটা
নিজস্বতা ছিল। আর তাই তাঁর বিরুদ্ধে এই সমালোচনার তীর।
ভিভালডির বেড়ে ওঠা ভেনিসে।
বয়স হবার পর তিনি যাজক হওয়ার জন্য মনস্থির করেন। এই সিদ্ধান্ত এবং সেইসঙ্গে তাঁর লম্বা
লাল চুলের কারণে তাঁকে ডাকা হতো ‘দ্য রেড প্রিস্ট।’
কিন্তু ভিভালডি খুব বেশীদিন
যাজকবৃত্তি করেননি। তাঁর দুর্নাম ছড়িয়ে পড়েছিল। যেমন: একদিন মাস্-এর সময় তাঁর মাথায়
একটা দুর্দান্ত সুর এলো। কোনো দ্বিধা না করে বা ক্ষমা না চেয়েই তিনি বেদী থেকে নেমে
গেলেন এবং সুরটা লিখে ফেলার জন্য কাগজ খুঁজতে পাশের ঘরে দৌড়ে গেলেন। উপস্থিত সকলে একেবারে
হতবাক হয়ে গিয়েছিল এই ঘটনায়।
এই ঘটনায় ভিভালডিকে শাস্তির
জন্য আদালতের মুখোমুখি হতে হয়ছিল। সৌভাগ্যক্রমে, বিচারক সেদিন খোশ মেজাজে ছিলেন। তাই
রায়ে মেধাবীকে ছেড়ে দেওয়া হল। তবে, শাস্তি হিসেবে ভিভালডিকে আর কোনোদিন মাস্-এ যেতে
দেওয়া হয়নি।
ওয়েওয়ার্ড
গার্লস ফিলহারমোনিক
ভিভালডির পরের চাকরিটি
৩৫ বছর টিকেছিল এবং এখান থেকেই তিনি অবসরে যান। তিনি অসপেডালে ডেল্লা পিয়েতা (অর্থাৎ,
ক্ষমার হাসপাতাল)-এর একজন বেহালা শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। এটা ছিল এক অভূতপূর্ব প্রতিষ্ঠান।
এটি ছিল একইসাথে একটা সংগীত সংরক্ষণাগার এবং অবৈধ মেয়ে বাচ্চাদের স্কুল।
বছরে বছরে, ভিভালডির
ঘাড়ে একে একে ওই প্রতিষ্ঠানের সমস্ত ভার এসে পড়তে লাগল। শেষপর্যন্ত দেখা গেল তিনিই
প্রতিষ্ঠানটি চালাচ্ছেন। তিনি সপ্তাহান্তে কনসার্ট আয়োজন করতেন যেটা পরবর্তীতে ইউরোপ
জুড়ে সুনাম কুড়িয়েছিল। যখনই তিনি তাঁর প্রিয় কোনো ছাত্রীর সংগীত দক্ষতা সকলকে দেখাতে
চাইতেন, তখনই তিনি সেই ছাত্রীর বাজানোর জন্য একটা করে কনসার্টো লিখে ফেলতেন।
ভিভালডির কনসার্টোর তিনটি
করে মুভমেন্ট বা অংশ থাকত, এবং সেগুলো নির্দিষ্ট কাঠামো অনুসরণ করত। এই কাঠামোটিই পরে
বারোক সংগীতকারদের কাছে অনেকটা মডেল হিসেবে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। তাঁর কাঠামোটা ছিল এরকম:
দ্রুত লয় - ধীর লয় - দ্রুত লয়
ভিভালডির
সংগীত
আমি নিশ্চিত আপনারা কোথাও
না কোথাও ভিভালডির সুর শুনেছেন, বিশেষ করে তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত দ্য ফোর সিজনস। এটা
হল চারটি কনসার্টোর একটা সেট যেটা অর্কেস্ট্রার সাথে বেহালা দিয়ে বাজাবার জন্য লেখা
হয়েছিল। প্রতিটা কনসার্টো একটা করে ঋতুর বৈশিষ্ট্যকে প্রকাশ করে।
বসন্তের কনসার্টোটি পাখির
গানের মত সুরে ভরা, সঙ্গে ঘনঘন মেঘেরচমক, ঘুমন্ত ভেড়ার পালের দিকে ক্রুদ্ধ কুকুরের
ডাক, ভেড়াদের আনন্দনৃত্য আর পরীদের দিয়ে ভরা। আবার গ্রীষ্মকালের কনসার্টোটি শুনলে মনে
হবে যেন উত্তপ্ত সূর্যের তাপ গায়ে এসে লাগছে। আরও মনে হবে যেন কোকিল ডাকছে, মশা কামড়
দিচ্ছে আবার কখনো ঝড়ের তান্ডব বয়ে যাচ্ছে। শরতের কনসার্টো শুরু হয় মাতাল কৃষকের গান
দিয়ে আর শেষ হয় বুনো শিকারের তান্ডব দিয়ে। সমস্তটা হান্টিং হর্ন বাজিয়ে পরিবেশন করা
হয়। আর, শীতের কনসার্টোটি শুনলে মনে হয় যেন জমে যাচ্ছি, কাঁপছি, পায়ে পা লেগে যাচ্ছে
আর আগুন পোহাচ্ছি। পরক্ষণেই মনে হবে কে যেন আবার আমাকে বাইরে নিয়ে গেল, সামনে শুধুই
হিম বরফ। সবমিলিয়ে একটু রূঢ় অবশ্যই। এইসব অনুভূতিই সংগীতের মধ্যদিয়ে চমৎকারভাবে ফুটে
উঠেছে।
ফোর সিজনস ব্যাপকভাবে
সমাদৃত। অসংখ্য বিজ্ঞাপণ, চলচ্চিত্র এবং টেলিভিশন অনুষ্ঠানে এটি ব্যবহৃত হয়েছে। ভিভালডির
আরও কিছু উল্লেখযোগ্য সংগীত হল:
●Concerto for Guitar in D major, RV 93
●Concerto for Two Trumpets in C major, RV 537
●Sonata for Two Violins, in F major, RV 60
●Gloria (oratorio for three solo singers, chorus, and
orchestra), RV 589
●Concerto for Two Cellos in G minor, RV 531
●Double Orchestra Concerto, RV 585
জর্জ ফ্রেডরিক
হ্যান্ডেল
ভিভালডি যখন ভেনিসে বসে
সংগীত রচনা করছিলেন, আরেকজন সংগীতকার তখন জার্মানি থেকে ইংল্যান্ডে যাবার প্রস্তুতি
নিচ্ছিলেন। তিনি হলেন জর্জ ফ্রেডরিক হ্যান্ডেল (১৬৮৫-১৭৫৯)। সমকালীন তো বটেই, তাঁর
মৃত্যুপরবর্তী সংগীতের উপরেও ছিল তাঁর অগাধ প্রভাব।
হ্যান্ডেলের জন্ম জার্মানিতে কিন্তু তাঁর সংগীতে তালিম ইতালিতে।
তারমানে, তিনিই হলেন সর্বশ্রেষ্ঠ ইংরেজ সংগীতকারদের একজন। কিছুই বোঝা গেল না? বাদ দিন,
আস্তে আস্তে পরিষ্কার হয়ে যাবে।
আসলে, কাহিনীটা অন্য
জায়গায়। হ্যান্ডেলের বাবা ছিলেন একজন জার্মান নাপিত-ডাক্তার (তখনকার দিনে নাপিতেরা
কিঞ্চিৎ ডাক্তারিও করতেন)। বাবার সাথে থেকে থেকে লোকের উপর ডাক্তারি করতে করতেই জর্জ
ফ্রেডরিক একসময় অর্গানে বসে যান। আঠারো বছর বয়সে বড় শহর হামবুর্গে যাবেন বলে ঘর ছাড়েন।
সেখানে তিনি সংগীতকার এবং শিল্পী হিসেবে কাজও পেয়ে যান।
হ্যান্ডেল জানতেন যে
পুরো ইউরোপ জুড়ে অচিরেই ইতালিয় অপেরার জয়জয়কার হবে। আর তাই বাইশ বছর বয়সে তিনি ইতালিয়
ঘরানার সংগীত শিখতে ইতালি চলে যান। সেখানে তাঁর দেখা হয় সেখানকার মহাতারকা এন্টনিও
ভিভালডির সাথে।
তাঁর কাছ থেকেই কনসার্টোয় হাতেখড়ি। এরপর অল্প সময়ের জন্য জার্মানি ফিরেই হ্যান্ডেল
চিরতরে লন্ডনে পাড়ি জমান।
ইংল্যান্ডে গিয়ে তিনি
৩৬টি অপেরা লেখেন যেগুলোর বেশীরভাগই মাস্টারপিস। কিন্তু লোকের পছন্দ পাল্টাচ্ছিলো।
সেইসময়ের জনপ্রিয় ধারা ছিল বাইবেলের গল্প থেকে বানানো গান বা ওরাটরিও। হ্যান্ডেল বুঝতে
পারলেন এবং তিনিও ওরাটরিও লেখা শুরু করলেন। ওরাটরিও হলো এক ধরনের গান যার কথাগুলো নেওয়া
হতো বাইবেল থেকে আর কোনো গায়ক একা খালি গলায় বা কোরাসের সঙ্গে বা অর্কেস্ট্রার সাথে
তা গাইতেন।
এইসব ওরাটরিওর মধ্যে
সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিলো মেসিয়াহ। এটি প্রথম বাজানো হয় ১৭৪২ সালে। মেসিয়াহ’র জনপ্রিয়তার
কথা বলতে হলে বলতে হয় এটি এতোই জনপ্রিয় হয়েছিলো যে পুরুষ শ্রোতাদের অনুরোধ করা হতো
তারা যেন তাদের তরবারি ঘরে রেখে এটা শুনতে আসেন এবং নারী শ্রোতারা যেন তাঁদের হুপগুলো
খুলে রেখে আসেন, যাতে বেশী মানুষকে ঢুকতে দেওয়া যায়।
প্রচণ্ড মেধাবী হ্যান্ডেল
তাঁর মেজাজের কারণেও বিখ্যাত ছিলেন। তাঁর তিরিক্ষ মেজাজের কথা সংগীত মহলে ছড়িয়ে পড়েছিলো
এবং তিনি অচিরেই হাসি-ঠাট্টার পাত্রে পরিণত হয়েছিলেন। যেমন: সর্বজনবিদিত যে, হ্যান্ডেল
বাদ্যযন্ত্র টিউন করার শব্দ সহ্য করতে পারতেন না। কাজেই যখন তাঁর কনসার্ট থাকতো, তখন
সকল যন্ত্রীদের প্রতি তাঁর নির্দেশ থাকতো যেন তিনি মঞ্চে ওঠার আগেই সব বাদ্যযন্ত্র
ঠিকঠাক টিউন করে রাখা হয়।
একবার এক সন্ধ্যায় এক
দুষ্টু লোক লুকিয়ে থিয়েটারে ঢুকে পড়ে এবং কনসার্ট শুরুর আগে সবগুলো যন্ত্রের টিউন নষ্ট
করে দেয়। হান্ডেল যেইমাত্র বাজনা শুরু করলেন কিচিরমিচির শব্দ ছাড়া আর কিছুই বের হলো
না। একসাথে পঞ্চাশটা নষ্ট টিউনের বাদ্যযন্ত্র বেজে উঠলে কি হতে পারে ধারণা করুন। হ্যান্ডেল
ক্ষেপে বোম হয়ে গেলেন। রাগের মাথায় তিনি একটা বিরাট ডাবল বেস তুলে নিলেন এবং সেটা ছুঁড়ে
মারলেন। তারপর একটা কেটলড্রাম তুলে সর্বশক্তি দিয়ে সেটা এক বেহালাবাদকের দিকে ছুঁড়ে
মারলেন। হুটোপুটিতে তার পরচুলা খসে গেল, দর্শকেরা আর চেপে রাখতে না পেরে হেসে উঠলো
আর হ্যান্ডেলও পড়িমড়ি করে স্টেজ থেকে বেরিয়ে গেলেন।
রাজকীয় বিপদ
১৭৪৯ সালে হ্যান্ডেল
অস্ট্রিয়ার সাথে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির বর্ষপূর্তি উদযাপন উপলক্ষ্যে রাজকীয় আতশবাজী উৎসবের
জন্য একটি গান লেখেন। এর প্রথম পরিবেশনাতেই ঘটে যায় সংগীতের জগতের এক মহা দুর্ঘটনা।
এই বিশেষ দিন উপলক্ষ্যে
রাজা একজন স্থপতিকে নিয়োগ দিয়েছিলেন মঞ্চের পেছনে একটা বিরাট চিত্রকর্ম তৈরি করার জন্য।
সেই স্থপতি ৪০০ ফুট চওড়া এবং ১০০ ফুট লম্বা একটা চিত্রকর্ম তৈরি করেছিলেন। তার সঙ্গে
২০০ ফুট লাঠি দিয়ে বেঁধে দিয়েছিলেন এক বিরাটকায় সূর্যের ছবি।
যেদিন উৎসবের দিন এলো,
হ্যান্ডেল স্বয়ং বাজনাটি পরিচালনা করতে মঞ্চে উঠেছিলেন। প্রথম অর্ধেকটা সময় সবকিছু
ঠিকঠাক চলছিলো। এরপরই শুরু হয় আতশবাজী।
হ্যান্ডেল সম্ভবত বাজনার
মাঝপথে আতশবাজী ফোটার ব্যাপারটায় একটু বিরক্ত হয়েছিলেন। কিন্তু ঘটনা অন্যদিকে মোড় নেয়
যখন আতশবাজীর আগুন ছবির উপরেও এসে পড়ে। এরপর যা হবার তাই হলো, আগুন ধরে গেল মঞ্চে।
উপস্থিত জনতা প্রাণভয়ে ছোটাছুটি শুরু করে দিলো, কিন্তু হ্যান্ডেল নাছোড়বান্দার মতো
বাজনা চালিয়েই গেলেন।
হ্যান্ডেলের
সংগীত
হ্যান্ডেলের সংগীত বারোক
ঘরানার সংগীতের অন্যতম উদাহরণ। তাঁর গানগুলো টাটকা, নৃত্যপ্রবণ এবং বেশীরভাগ সময়ই আবেগতাড়িত।
হ্যান্ডেলের গতি দেখে মুগ্ধ হতে হয়। তিনি তাঁর বিখ্যাত মেসিয়াহ ওরাটরিও লিখেছিলেন যেটার
দৈর্ঘ্য ছিল দুইঘন্টারও বেশী। তবুও সেটা মানুষ ধৈর্য নিয়ে শুনত, প্রতিবছর বড়দিন আর
ইস্টারে সারা পৃথিবীর বড় বড় সব শহরে আজও তিন সপ্তাহ ধরে এটি বাজানো হয়।
হ্যান্ডেলের কাজ বহু।
তবে তাঁর রেকর্ডিংগুলো খুঁজে পাওয়া সহজ। হ্যান্ডেলের এই সুরগুলো শোনা যেতে পারে:
●Messiah, an oratorio for solo singers, chorus, and orchestra
ব্যক্তিগতভাবে একটু আগে থেকে হলেও, ২০১৭ সালে রাজশাহীতে স্বরসংকেত স্কুল তৈরি করার পর আমরা কয়েকজন মিলে পাশ্চাত্য সংগীতের ইতিহাস, তার গঠন, কাঠামো ইত্যাদি নিয়ে পড়তে শুরু করেছিলাম। আমি, উচ্ছ্বাস, ফারহান আর অথই মিলে শুরু। আমরা লুসিয়ানো এলবার্টি’র মিউজিক অফ দ্য ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ড পড়তে শুরু করেছিলাম। আমি পড়তাম, বাংলা করে বাকিদের বুঝিয়ে দিতাম। পরে যুক্ত হয়েছিল তানভীর, রূপমসহ আরও অনেকে। আমি যখন পড়তাম এবং বাংলা করে বুঝিয়ে দিতাম তখন পুরো জিনিসটা রেকর্ড করা হতো। পড়া শেষে পালাক্রমে একজন একজন করে সেই রেকর্ড বাড়ি নিয়ে যেতো এবং সেটা ট্রান্সস্ক্রিপ্ট করে এনে দিতো। এভাবে বইটার একইসাথে অনুবাদের কাজও চলছিলো। আমরা প্রায় অর্ধেকেরও বেশী পড়ে অনুবাদ করে ফেলেছিলাম।
বাঙালির আর দশটা কাজের মতোই এ কাজেও আমাদের বেশীদিন দম থাকলো না। সংগীতচর্চার ক্ষেত্রে এই ভাঙন তো নতুন কিছু না। অনেকেই ঝরে পড়লো। আমাদের পড়াতেও ভাটা পড়লো। ওই অমূল্য বইটি আমরা পেয়েছিলাম বরেন্দ্র মিউজকাল একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা ও শিক্ষক জন থর্পের কাছ থেকে। থর্প ছিলেন আমাদের সবার পাশ্চাত্য সংগীতের গুরু। স্বরসংকেতের বেশীরভাগই বরেন্দ্র মিউজিকালেও বাজানো শিখতে যেতো।
সেইসময় বাংলা ভাষায় পাশ্চাত্য সংগীতের ইতিহাস অনুবাদ করতে গিয়ে আমি যে বিপদে পড়েছিলাম তা হল সংগীতের পরিভাষা। আমাদের এদেশের সংগীত আর পাশ্চাত্য সংগীতের মধ্যে একটা বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। আমাদের সংগীত মূলত হরাইজেন্টাল সংগীত। এতে হারমোনির উপস্থিতি খুবই কম, বিশেষ করে ধ্রুপদী সংগীতের ক্ষেত্রে। কিন্তু, পাশ্চাত্য সংগীত ভার্টিকাল সংগীত, এতে রয়েছে জটিল হারমোনির কারুকার্য। এইযে হারমোনি শব্দটি আমাকে ব্যবহার করতে হচ্ছে, এর কোনো যুতসই বাংলা শব্দ আমি পাইনি। রবীন্দ্রনাথ সম্ভবত একে স্বরসংগতি নাম দিয়েছিলেন কিন্তু এই সময়ের প্রেক্ষিতে স্বরসংগতি ব্যবহার করে লেখায় গতির সঞ্চার করা যায় না। এমনি আরও অসংখ্য সংগীতের ইতালিয়, ল্যাটিন, ইংরেজি শব্দের সঠিক বাংলা পরিভাষা পাওয়া যায় না। আসলে, এই অঞ্চলে এইসব পরিভাষা নিয়ে তেমন কোনো কাজই হয়নি। ঠিক যেমন সামগ্রিকভাবে কোনো কাজ হয়নি পাশ্চাত্য সংগীত ও তার ইতিহাস নিয়ে।
অথচ, আমাদের মূলধারার সংগীত থেকে শুরু করে লোকসংগীতেও পাশ্চাত্য সংগীতের প্রভাব অনস্বীকার্য। এখন তো আমরা হারমোনি আর পাশ্চাত্য যন্ত্রের সঙ্গত ছাড়া বাংলা গান কল্পনাই করতে পারিনা। রবীন্দ্রনাথের পরে সলিল চৌধুরীর কল্যাণে বাংলা গানে অর্কেস্ট্রেশনের শুভ সূচনা হয়েছিলো। এরপর তা গানের খোল-নলচে পাল্টে দিয়েছিলো। এতো বিপুল ব্যবহারের পরেও কেন আমাদের দেশের সংগীতে পাশ্চাত্য সংগীতের ইতিহাস এবং সেই ইতিহাস এবং ব্যাকরণ পাঠের জন্য অত্যাবশ্যক পরিভাষা নিয়ে কোনো কাজ হলো না সে এক বিস্ময়।
যাহোক, এই পরিভাষা সংকট দেখে আমি এবং থর্প ঠিক করেছিলাম কিছু পরিভাষা নিজেরাই তৈরি করে নেবো। এই নিয়ে কিছুদূর এগোনোও গিয়েছিলো, কিন্তু তা আর শেষ হয়নি। থর্প বাংলাদেশ ছেড়ে চলে গেলেন, আমিও আলসেমি আর জীবিকার তাগিদে ফেলে রাখলাম কাজটা। তারপরেও মনটা খচখচ করছিলো, অন্তত যদি পাশ্চাত্য সংগীতের একটা ইতিহাস লেখা যেতো। পশ্চিমবঙ্গের কথা বলতে পারবো না, তবে বাংলাদেশে যে এই ইতিহাসও খুব ভালোভাবে, যত্ন নিয়ে লেখা হয়নি সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। কিন্তু, পাশ্চাত্য সংগীতের ইতিহাস তো আর চাট্টিখানি কথা নয়, কয়েকশো বছরের ইতিহাস, যার শুরুটা করতে হবে আদিম যুগ থেকে। এরজন্য যতখানি বিদ্যা প্রয়োজন সেটুকু তো আমার নেই। সুতরাং, লিখতে হলে আগে পড়তে হবে। বা, পড়তে পড়তেই লিখতে হবে।
এরমধ্যে রিপন কুমার সরকার আমাকে চেপে ধরলো পাশ্চাত্য সংগীতের একটা ছোটোখাটো ইতিহাস বুঝিয়ে বলতে হবে। আমি বললে সে সেটা থেকে নোট করে ক্লাসে প্রেজেন্টেশন দিবে। তখন বোধ করলাম, বিস্তারিত না হোক, অন্তত অতি সংক্ষেপেও যদি একটা ইতিহাস বাংলা ভাষায় লেখা যেতো তো কিছু একটা হতো। সেই ভাবনা থেকেই এই লেখা।
এটি পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সংগীতের অতি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। এই ইতিহাস লিখতে গিয়ে আমাকে হাবুডুবু খেতে হয়েছে কাকে ছেড়ে কাকে রাখবো আর কোন বিষয়টা ছেড়ে কোন বিষয়টা লিখবো। আমি চেয়েছিলাম যেটুকু না জানলেই নয় সেটুকু লেখা। তবে, লিখতে গিয়ে আবারো সেই পারিভাষিক বিড়ম্বনায় পড়তে হলো। মন খচখচ করতে লাগলো যে, এমন অনেক শব্দ আসবে যেগুলোর সঙ্গে পাঠক হয়তো পরিচিত নন। সেগুলোর কোনো ব্যাখ্যা না দিয়েই এই ইতিহাস লেখা হলো। সেসব ব্যাখ্যা করার জন্য আস্ত আরও লেখা হয়ে যাবে। সেই লেখা হয়তো সামনে কোনোদিন লিখবো বা অন্যকেউ নিশ্চয়ই লিখবেন। আপাতত যেটুকু চাইছি সেইটুকুই বরং করা যাক।
এই লেখাটিকে আমি আমার মৌলিক লেখা বলে দাবী করব না, আবার অনুবাদও বলবো না। এতে ইতিহাসের কালক্রম এবং সংগীতের তালিকা নেওয়া হয়েছে এক অতি সহজপাঠ্য বই থেকে। বইটা হল ডেভিড পোগ এবং স্কট স্পেকের লেখা ক্লাসিকাল মিউজিক ফর ডামিস। আর সঙ্গী হিসেবে ছিলো ডেভিড গ্রাউট এবং পিটার বার্কহোল্ডারের এ হিস্ট্রি অফ ওয়েস্টার্ন মিউজিক। তাছাড়া ইন্টারনেট তো ছিলোই। এই বইদুটি পাইরেটেড বইয়ের অসামান্য লাইব্রেরি, লাইব্রেরি জেনেসিস থেকে পাওয়া। লাইব্রেরি জেনেসিস পৃথিবীতে ছিলো বলেই আমরা এইখানে বসে এতো দামী এবং মূল্যবান বইপত্র হাতের কাছে পেলাম। জেনেসিসের প্রতি ভালোবাসা।
পাশ্চাত্য সংগীতের আমি কোনো বোদ্ধা নই, একজন আগ্রহী নবীস শ্রোতা মাত্র। তবে, আমরা যখন স্বরসংকেতে বসে বই পড়তাম এবং আলাপ করতাম তখন সেই আলাপটা শুধুমাত্র সংগীতের ইতিহাসেই আটকে থাকতো না। খুব প্রাসঙ্গিকভাবেই চলে আসতো তৎকালীন রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ এবং অন্যান্য শিল্পকলা নিয়ে আলাপ। আসলে সবকিছুর সাথেই সবকিছুর যোগ। ইতিহাসের বড় বড় সব ঘটনার ছাপ শিল্পকলার সমস্ত শাখাতেই পড়েছে। মানুষের মনস্তত্ত্বের গভীর চিন্তাও পড়েছে। আর তাই শিল্পকলা ও সংগীতের প্রতিটা যুগের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য মোটাদাগে বোঝা যায়। আবার, কোনো যুগই হঠাৎ একদিনে আলাদা হয়ে যায়নি। দিনের পর দিন একটু একটু করে পরিবর্তন হয়েছে। পরিবর্তন হয়েছে কিছু সাহসী মানুষের জন্য, যাঁরা নিয়ম ও প্রথা ভেঙেছেন। সংগীত অবশ্যই একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার, আবার একইসাথে একটি সামষ্টিক প্রচেষ্টারও ফল। তাই, সংগীতের যুগবিভাগ করা শুধু কঠিন কাজই নয়, অসম্ভবই বলা যায়। তবুও, পাশ্চাত্য সংগীতের কালকে কয়েকটি নির্দিষ্ট যুগে ভাগ করা গেছে এবং এই ভাগগুলো যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতাও পেয়েছে। সেই যুগবিভাগ ধরে শিল্পকলার অন্যান্য ধারাগুলোর তুলনামূলক পাঠও সহজ হয়ে যায়।
প্রাচ্যের ধ্রুপদী সংগীতে লোকসংগীতের প্রভাব আগে। লোকসংগীতই ধ্রুপদী সংগীতের জন্ম দিয়েছে এই হল হেমাঙ্গ বিশ্বাসের বরাতে আমার মত। কিন্তু পাশ্চাত্য সংগীতের বেলায় মূলধারার ইতিহাস জানাচ্ছে পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সংগীতে রোমান্টিক যুগে এসে লোকসংগীত মিশেছে। এখানেই সংগীতের রাজনীতি টের পাওয়া যায়। অনুরূপ একটি ইতিহাস প্রাচ্য সংগীতের বেলায়ও লেখা হয়েছে এবং সেটাই মূলধারার ইতিহাস হয়ে উঠেছে। কিন্তু, সংগত কারণেই লোকসংগীতই প্রতিটা অঞ্চলে প্রাচীনতম সংগীত। তাহলে, পাশ্চাত্য সংগীতের বেলাতেও যে লোকসংগীতের প্রভাব শুরু থেকেই নেই সেকথা নিশ্চিতভাবে কেমন করে বলা গেল? নিশ্চয়ই ইতিহাসের এই পাঠের বাইরেও কোনো পাঠ আছে, যা আমার গোচরীভূত হয়নি। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি সেই পাঠও পাওয়া যাবে।
এই বড় হবার লড়াই নিশ্চয়ই অনেক তাৎপর্য বহন করে। লোকসংগীত বনাম ধ্রুপদী সংগীতের এই দ্বন্দ্বই ক্ষমতা বনাম স্বাধীনতার আদি দ্বন্দ্ব। সেই হিসেবে সংগীতের ইতিহাস কোনো অ-রাজনৈতিক ইতিহাস নয়। আরও বড় করে বলতে গেলে, শিল্পকলার ইতিহাস অ-রাজনৈতিক ইতিহাস নয়। ধ্রুপদী সংগীতের পৃষ্ঠপোষণ করেছে রাজা ও ধনিক সম্প্রদায় এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো; এককথায় শাসক সম্প্রদায়। আর, লোকসংগীতের উপর তাদের আক্রমণ বহুবার বহুভাবে এলেও লোকসংগীত তার মুক্ততার জন্য বারবার নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছে আপন পরম্পরায়। লোকসংগীতের দ্বার উন্মুক্ত। সে সবার থেকে নিতে জানে এবং সবাইকে দিতেও জানে। হেমাঙ্গ বিশ্বাস যেমনটা বলেছিলেন, ধ্রুপদী সংগীতের রয়েছে ঘরানা আর লোকসংগীতের বাহিরানা। এই ঘরানা আর বাহিরানার দ্বন্দ্ব চিরকালীন। তবে, পাশ্চাত্য সংগীতের ক্ষেত্রে রোমান্টিক যুগে এসে আমরা দেখতে পাচ্ছি ধ্রুপদী সুরকারগণ লোকসংগীতকে সাদরে গ্রহণ করছেন। একই ঘটনা আমরা এইখানেও দেখতে পাই। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত সেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখের পরম্পরায় আমরা দেখলাম লোকসংগীত এবং ধ্রুপদী সংগীতের মিলন, সময়কাল পাশ্চাত্য সংগীতের ঠিক রোমান্টিক যুগেই। এসব কাকতালীয় নয় একদম, ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উত্থানও সেই সময়েই। এই মিলনের পেছনে জাতীয়তাবাদী চেতনা কাজ করেছে সচেতনভাবে। আবার সময়ের প্রয়োজনে যার যার মতো আলাদা পথও ধরেছে দুই ধারার সংগীত। ধ্রপদী সংগীত আপন মহিমায় আবার ব্রাত্যজনকে ভুলেছে, বেঁধেছে নিয়মকানুনের কঠিন বাঁধনে, তৈরি করেছে একদল কট্টর বিশুদ্ধবাদী সমর্থক। এখানেই সংগীতের রাজনীতি। এই রাজনীতি বুঝতে হলেও সংগীতের ইতিহাস তো জানতে হবে।
জানতে হবে ভবিষ্যতের সংগীতের স্বার্থেও। ইতিহাস থেকে করণীয় আঁচ করা যায়। ধ্রুপদী এবং পপ সংগীত চিরকালই বাজারের জিনিস ছিল। সে লোকসংগীতের কাছ থেকে যখন যেমন পেরেছে নিয়েছে বটে। আর তারপর তা পরিবেশন করেছে বাজারে। উপরন্তু কপিরাইট করেও তাতে আপন লভ্যাংশ নিশ্চিত করেছে। অপরদিকে লোকসংগীত সবসময় ফিরেছে মানুষের মুখে মুখে। মানুষের সমাজই একে দেখভাল করেছে, কদর করেছে। ভবিষ্যতের সংগীত কি বাজারের মধ্যেই থাকবে? নাকি কিছু মানুষ এগিয়ে আসবে বাজারের কবল থেকে সংগীতকে মুক্ত করতে? তবেই না পৃথিবী এবং মানুষের শিল্পকলা ও সমাজ আরেক নতুন যুগে প্রবেশ করবে। অন্যকোনোভাবে নয়।
ইস্ক্রা
খুলনা
ভূমিকা
মানুষের সভ্যতা যেদিন থেকে শুরু হলো সেদিন থেকেই গান তার সাথী। আদিম মানুষ থেকে শুরু করে আজকের মানুষ অবধি যে যন্ত্রটি মানুষের গানের সবচেয়ে বড় সঙ্গী তা হলো তার গলা। আদিম মানুষ গলা দিয়ে যে আওয়াজ বের করতো তার মধ্যেও এক ধরনের সংগীতময়তা ছিল বৈকি।
যুগের সাথে সাথে সংগীতের ভিতরকার গঠন আরও জটিল হয়েছে। মানুষ বাদ্যযন্ত্র আবিষ্কার করেছে। যতদূর মানুষের গলা পৌঁছাতে পারেনা বাদ্যযন্ত্র এখন ততদূর পৌঁছাতে পারে। পাইপ অথবা হুইসেলের মত বিভিন্ন ধরনের বাঁশি পাখির শব্দ নকল করতে পারে, বাতাসের মত আওয়াজও করতে পারে; আবার বিভিন্ন ধরনের ড্রাম অনুকরণ করতে পারে হৃৎপিণ্ডের ধুকুপুকানি। আধুনিক সময়ে গানের স্কেল বা স্বরগ্রামের প্রমিতকরণ হয়েছে। বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে সামঞ্জস্য তৈরি করা হয়েছে। আর এইভাবেই জন্ম নিয়েছে ধ্রুপদী সংগীত।
মানুষের প্রথমদিককার গানগুলোর বিষয়বস্তু ছিল ধর্মীয়। প্রতিকূলতার মধ্যে বাস করা আদিম ভীত-সন্ত্রস্ত মানুষেরা পূজা অর্চনার সময় গেয়ে গেয়ে দেবতাদের উদ্দেশে প্রার্থনা করতো। তারা প্রকৃতির অনুকরণ করতো; যখন বাতাস বইতো, তারা বাতাসের শব্দের অনুকরণ করতো, যখন আকাশ মেঘে ছেয়ে যেতো, তারা বৃষ্টির শব্দের অনুকরণ করতো; বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে গান গাইতো। তারা নিজেদের বিভিন্ন সাফল্যেও গান গাইতো, ভাল শিকার জুটিয়ে দিলে দেবতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতেও তারা গাইতো।
সংগীতের ইতিহাসে সবচেয়ে পুরাতন ধারণাটি হল তালের ধারণা। প্রতিদিনকার হাঁটাচলা, দৌড়, শিকারের কসরত, ভয় কিংবা আনন্দ প্রকাশে আদিম মানুষ বিভিন্ন তাল ব্যবহার করত। এই তালের সাথে সাথে তৈরি হয়েছিল বিভিন্ন নাচ - দেবতাদের উদ্দেশে সেসব নাচ নাচা হত। আর নাচের অনুষঙ্গ হিসেবেই সংগীতের আবির্ভাব হয়েছিল।
সেইসব আদিম দিনগুলোতে গানের পরম্পরা মুখে মুখে রক্ষা হতো। এমনকি, আজও প্রাচ্যের সংগীতে এই মৌখিক পরম্পরাই চলে আসছে। মাত্র এক হাজার বছর বা তারও একটু আগে মানুষ সংগীতের স্বরলিপি করতে শিখেছিল।
মধ্যযুগ
যে যুগকে মানুষ আজ মধ্যযুগ নামে ডাকে সেই যুগটা ছিল প্লেগ, মহামারী আর মারামারির যুগ। এসব বাদেও সেই যুগের একটা ইতিবাচক দিকও আছে। ইউরোপের বিভিন্ন বিহারগুলোতে যাজকেরা তখন করছিলেন সংগীতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক সংস্কার - স্বরলিপিকরণ।
গ্রেগরিয়ান চান্ট
ততদিনে সংগীতের নেহাত কম বয়স হয়নি, তবে তখনো কারও মাথায় আসেনি যে সুর লিখে রাখা উচিত। তবে, ৬০০ খ্রিস্টাব্দে পোপ প্রথম গ্রেগরি তৎকালীন চার্চগুলোতে যে সংগীত ব্যবহার হতো সেগুলোর স্কেলগুলোকে বোঝার সুবিধার জন্য একটা পদ্ধতি তৈরি করে ফেলেন। আজকাল গানের স্বরগুলোর যেসব নাম আমরা জানি যেমন: A, B, C, D এইসব কাল্পনিক নামকরণের কৃতিত্ব এই পোপ প্রথম গ্রেগরির।
পোপ গ্রেগরির নাম থেকেই গ্রেগরিয়ান চান্ট নামের উৎপত্তি। এটা শুনতে অতি সরল কিন্তু অত্যন্ত চড়াই-উতরাইওয়ালা সুরের খেলা এর ভিতরে আছে। ল্যাটিন ভাষায় লেখা এইসব গান বাদামী গাউন গায়ে দিয়ে একদল চার্চের লোক একই সুরে একসাথে গাইতো। পোপ গ্রেগরি যদি জানতেন যে, বিশ শতকের শেষে এসে এই গ্রেগরিয়ান চান্টই সারা পৃথিবীতে অন্যতম জনপ্রিয় গান হিসেবে বিবেচিত হবে, তাহলে হয়তো তাঁর চোয়াল ঝুলে যেত। স্পেনের কোনো মঠের একদল ব্রাদারের গাওয়া ‘চান্ট’ নামের একটা রেকর্ডিং বের হওয়ার পর সেটা আমাদের সময়ে টপ চার্টে জায়গা করে নিয়েছিল।
গ্রেগরিয়ান চান্টের এই প্রত্যাবর্তনের পিছনে অবশ্যই কিছু কারণ ছিল। এর মধ্যে সত্যিই আধ্যাত্মিক গভীরতা আছে। আপনি যদি চোখ বুঁজে একমনে গ্রেগরিয়ান চান্ট শুনতে থাকেন তাহলে আপনার মনেও এক ধরনের প্রশান্তি আসতে বাধ্য।
সাধু গুইডোর কথা
গুইডো অফ আরেৎজো ছিলেন তখনকার দিনের এক মেধাবী সাধু। ইনি সংগীতের বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার করেছিলেন, যেমন ‘ডো, রে, মি, ফা….’ বলে স্কেলের স্বরগুলোকে গাইবার পদ্ধতি। এইরকম নির্দিষ্ট স্বরের জন্য নির্দিষ্ট সিলেবল বেঁধে দিয়ে গলায় গেয়ে গেয়ে চর্চা করার শতাব্দী প্রাচীন রীতি অনুসরণ করতেন অপেরা গায়ক ও গায়িকারা। পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের গায়ক-গায়িকারাও একইরকম পদ্ধতি অনুরসরণ করতেন। এই পদ্ধতিকে বলা হয় সোলফেজ। আমাদের ভারতীয় ঘরানাতেও একই পদ্ধতি আজও ব্যবহার করা হয়।
গুইডো অফ আরেৎজো নতুন একরকম স্বরলিপি পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন। একে বলা হত গুইডোনিয়ান হাত। এই নিয়ে এখানে বিস্তারিত আলোচনা করছি না। পাশ্চাত্য স্বরলিপি নিয়ে কোনো আলাদা লেখায় সেই ইতিহাস নিয়ে আলাপ করা যাবে। মোদ্দাকথা, আধুনিক স্বরলিপির মূল জিনিসগুলো গুইডো অফ আরেৎজোর হাতেই পত্তন হয়েছিল।
গুইডোর আবিষ্কারগুলো ছাড়া গানের আজকের দুনিয়াটা কেমন হতো তা এক ভাবনার বিষয় বটে। সৌভাগ্যবশত, আমাদের তা আর ভাবতে হচ্ছে না। কারণ গুইডো সত্যিসত্যিই ছিলেন এবং তাঁর তৈরি স্বরলিপি পদ্ধতি আজও প্রাসঙ্গিক।
মাস্-এর কথা
তবে গানে যে শুধু সাধু-সন্ন্যাসীদেরই ব্যক্তিগত অবদান সেরকম নয় মোটেও। তাদের প্রার্থনার ধরন-ধারণ, বিশেষ করে ক্যাথলিক মাস্গুলোর অবদানও কম নয়। পৃথিবীর অন্যতম সেরা কোরাল এবং অর্কেস্ট্রাল সংগীতের বেশকিছু মাস্ জাতীয় সংগীত বা ধর্মীয় সংগীত।
ক্যাথলিক মাস্ (ল্যাটিন ভাষায় মিসা) নামটি এসেছে এর প্রতিটি গানের শেষে ব্যবহৃত ‘Ite, missa est’ (চলতি কথায় ‘শেষ হল, এবার সবাই আসতে পারেন’) বাক্যটি থেকে। প্রতিটা মাস্ এবং ক্যাথলিক মাস্-এর উপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়া যাবতীয় সংগীতের শেষে এই একই বাক্য ব্যবহার করা হতো। আমাদের মধ্যে অনেকেই হয়তো কখনো কোনোদিন এই বাক্যগুলো শুনেছি নিশ্চয়ই: Kyrie eleison (প্রভু দয়া করুন); Gloria in excelsis (পরমেশ্বরের জয়); Sanctus, Sanctus, Sanctus (পবিত্র, পবিত্র, পবিত্র) এবং Agnus Dei (খোদার খাসি)। এগুলো সবই মাস্ জাতীয় সংগীতের বাক্য। রেনেসাঁর সময় থেকে আজকের সময় পর্যন্ত মাস্ সংগীতগুলো কেউ খেয়াল করে থাকলে এই বাক্যগুলো অবশ্যই শুনেছেন।
পুনঃজন্মের কাল: রেনেসাঁ
গুইডোর মৃত্যু এবং তাঁর ধারার ধর্মীয় সংগীতের ক্রম অবলুপ্তির ৪০০ বছর পর, সমাজ এক নতুন সময়কালে এগিয়ে যায় যার আজকের নাম রেনেসাঁ (ফরাসি শব্দ, যার অর্থ পুনঃজন্ম)। রেনেসাঁর যুগে শিল্প-সংস্কৃতির অভূতপূর্ব উন্নতি হয়। এই উন্নতিতে অংশ নেন সমাজের শিল্পানুরাগী ধনিক শ্রেণী এবং রাজা-রাজড়ারা।
রেনেসাঁ যুগের অন্যতম জনপ্রিয় ইতালিয় সংগীতাকার হলেন জিওভানি দ্য প্যালেস্ট্রিনা (১৫২৫-১৫৯৪)। তৎকালীন পোপের চ্যালা এবং অন্যতম প্রিয়পাত্র প্যালেস্ট্রিনার অন্যতম দিক হলো তিনি শুধুমাত্র গলায় গাইবার জন্য, যন্ত্রানুষঙ্গবিহীন সংগীত রচনা করতেন। তবে গ্রেগরিয়ান চান্টের মতো তা সবাই একই সুরে একসাথে গাইতো না। তার বদলে, তিনি তৈরি করেছিলেন অবিস্মরণীয় সব হারমোনি বা স্বরসংগতি। এর মানে হল, সেসব গানের মধ্যে একসাথে একাধিক স্বতন্ত্র সুর একসাথে বাজতো, এবং সেগুলো একে অপরের সঙ্গে সুন্দরভাবে সামঞ্জস্য রেখে একটা অপূর্ব তান তৈরি করতো।
প্যালেস্ট্রিনা মাস্ এবং অন্যান্য ধর্মীয় সংগীতের অন্যতম সেরা সংগীতকার ছিলেন। কিন্তু, সেই একই সময়ে সংগীতকারেরা ধর্মীয় সংগীতের বলয় থেকেও বের হতে চাইছিলেন। সেই সময় থেকে বিখ্যাত সব রোমান কবিদের কবিতা যেমন দান্তে’র ইনফার্নো এবং ধর্মীয় বলয়ের বাইরের অন্যান্য বিষয়বস্তুও গানের উপজীব্য হিসেবে ব্যবহার হতে শুরু হয়েছিল।
মাদ্রিগালের সূচনা
এইরকম বেশকিছু জনপ্রিয় সংগীতের ধারার একটি হলো মাদ্রিগাল। মাদ্রিগাল হলো এমন এক ধরনের গান যেখানে কমপক্ষে তিনটি কণ্ঠ দরকার হয়। সাধারণত, এতে কোনো যন্ত্রানুষঙ্গ থাকেনা। রেনেসাঁর কালে, পরিবারের সদস্যরা কিংবা বন্ধুবান্ধবরা একসাথে বসে এইসব মাদ্রিগাল গাইতো। প্রত্যেকে কণ্ঠ মেলানোর জন্য আলাদা আলাদা সুর বেছে নিতো এবং গাইবার সময় কেউ কোনো ভুল স্বর গেয়ে ফেললেই পাশেরজন তাকে কনুই দিয়ে গুঁতো দিতো।
মাদ্রিগাল গাইতে অত্যন্ত মজা লাগতো কারণ এতে এক বিশেষ ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করতে হতো। পদ্ধতিটির নাম ওয়ার্ড-পেইন্টিং। যখনই গানের কথায় কোনো বিশেষ কিছুর বর্ণনা করতে হতো, তখন গায়ককে সেটা সুরে সুরে অভিনয় করেও দেখাতে হত। যেমন, দীর্ঘশ্বাস বোঝাতে সাধারণত গায়ক চড়ায় সুর তুলে কণ্ঠটা আস্তে আস্তে খাদে নামিয়ে আনতো। অপরদিকে দৌড় এবং উড়ে বেড়ানো বুঝাতে কিংবা আনন্দ বুঝাতে গায়ক খুব দ্রুত অনেকগুলো স্বর গেয়ে ফেলত।
অপেরার স্বর্ণযুগ
ইতালিয় রেনেসাঁর স্বর্ণযুগের সময় বাস করতেন সংগীতকার ক্লডিও মন্টেভার্ডি (১৫৬৭-১৬৪৩)। মন্টেভার্ডি জনপ্রিয় মাদ্রিগাল ধারায় আরও সুরেলা সুর আর যন্ত্রানুষঙ্গ যুক্ত করেছিলেন।
মন্টেভার্ডিই হলেন গীতি-নাট্য বা অপেরার জনক। রেনেসাঁর যে বিভিন্ন দিক, তাতে অপেরা ছিল প্রাচীন গ্রীসের হারানো ঐতিহ্যের কথাগুলো ফিরিয়ে আনার একটা প্রচেষ্টা। এক্ষেত্রে, গ্রীক নাটকগুলোই ছিল প্রথম পছন্দ। এই নাটকগুলোকে প্রাচীন গ্রীসে খোলা জায়গায় মঞ্চ বানিয়ে তার সঙ্গে বিভিন্ন বাঁশি আর তারযন্ত্রের অনুষঙ্গ ব্যবহার করে পরিবেশন করা হত। মন্টেভার্ডি আর তাঁর বন্ধুরা এই ধারাটিকেই তাঁদের সময়ে আবার ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন। আর এর ফলে সংগীতও আর আগের মতো থাকলো না। তবে, দুঃখজনক হল এই কাজের জন্য মন্টেভার্ডি কখনো কোনো রাজা-রাজড়ার কাছ থেকে একটি কানাকড়িও পাননি।